নিজস্ব প্রতিবেদক: ছাত্রলীগের ‘কর্মী’ তকমা লাগিয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া, অস্ত্রের মুখে পোশাক খুলে ভিডিও ধারণ, অর্থ দাবি এবং পরবর্তীতে সেই পর্নোগ্রাফি দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে সমকাম ও যৌন নির্যাতন—চট্টগ্রাম নগরের হালিশহরে সন্দ্বীপ থেকে আসা শতাধিক কিশোর ও তরুণের ওপর দীর্ঘদিন ধরে চলা এমনই এক নজিরবিহীন ও ভয়াবহ অপরাধ সাম্রাজ্যের পর্দা উন্মোচিত হয়েছে।
দীর্ঘ অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে হালিশহরের বেড়িবাঁধসহ বিভিন্ন গোপন ‘টর্চার সেলে’ ১৭ থেকে ২২ বছর বয়সী সন্দ্বীপের স্থায়ী বাসিন্দা কিশোর-তরুণদের ওপর এই নির্যাতন চালানো হচ্ছে। অভিযোগের আঙুল উঠেছে স্থানীয় জিয়া সাইবার ফোর্স চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সহ-সভাপতি ও যুবদল নেতা নুর হোসাইন নুরু, তার সহযোগী মোয়াজ্জেম এবং তাদের সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে।
যেভাবে চলত ব্ল্যাকমেইল ও নির্যাতন চক্র
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ভুক্তভোগীদের বেশিরভাগই হালিশহরে পরিবারসহ বসবাসকারী সাধারণ শিক্ষার্থী বা কর্মজীবী। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে তাদের রাজনৈতিক তকমা দিয়ে অস্ত্রের মুখে তুলে নেওয়া হতো। এরপর পোশাক খুলে অশ্লীল ভিডিও ধারণ করা হতো। ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ৩০ হাজার থেকে শুরু করে লাখ টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ আদায় করত এই চক্র।
টাকা দেওয়ার পরও নিস্তার মিলত না; ধারণকৃত পর্নোগ্রাফিক ভিডিও কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে তাদের পুনরায় ডেকে এনে যৌন নিপীড়ন চালানো হতো। কেউ ডাকে সাড়া না দিলে বা টাকা দিতে না চাইলে ছবি-ভিডিও স্বজন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হতো। সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার ভয়ে কিংবা জীবনরক্ষায় অনেক ভুক্তভোগী পরিবার নিয়ে ইতিমধ্যে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
অস্ত্রের মুখে মুক্তিপণ আদায়ের কয়েকটি চিত্র
• আল শাহরিয়াল চৌধুরী ফায়েল (২৩): গত ১৫ মে হালিশহরের এস ক্লাব মোড় থেকে তুলে নিয়ে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে ২ লাখ টাকা দাবি করেন নুরু ও তার সঙ্গীরা। প্রাণভয়ে নগদ ও বিকাশের মাধ্যমে ৮০ হাজার টাকা দিয়ে রেহাই পেলেও পরে পুলিশের ভয় দেখালে তিনি এলাকা ছাড়েন।
• ১৭ বছর বয়সী কিশোর: ২০২৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি গাউছিয়া মোড় থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে নিয়ে কয়েক ঘণ্টা মারধর ও ভিডিও ধারণ শেষে বিকাশ নম্বর (০১৮১৮৪৮৪০১৬) মারফত ৪ দফায় ১ লাখ টাকা আদায় করা হয়।
• সাকিব (২১): ২০২৫ সালের অক্টোবর ও ডিসেম্বরে পরপর দুই দফায় তাকে তুলে নিয়ে নির্মাণাধীন ভবনে অশ্লীল ভিডিও ধারণ ও মারধর করা হয়।
রাজনৈতিক পরিচয় ও পুলিশের নাম ব্যবহার
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নুরুর মূল বাড়ি সন্দ্বীপের মাইটভাঙায় হলেও প্রায় ২০ বছর আগে পরিবারসহ হালিশহরে আসেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর হঠাৎ নিজেকে বিএনপি-যুবদল নেতা পরিচয়ে আত্মপ্রকাশ ঘটে নুরুর। স্থানীয় সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমানসহ রাজনৈতিক শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে ছবি তুলে তা ভয় দেখানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতেন তিনি। এমনকি ভুক্তভোগীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পুলিশকেও ব্যবহারের হুমকি দেওয়া হতো।
অবশেষে হালিশহর থানায় জোড়া মামলা
ধামাচাপা পড়ে থাকা এই ভয়াবহ অপরাধের বিরুদ্ধে অবশেষে আজ সোমবার (১২ অক্টোবর) হালিশহর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়ের করেছেন ১৭ বছর বয়সী এক ভুক্তভোগী কিশোর। এজাহারে উল্লেখ করা হয়, গত ২৮ আগস্ট তাকে জোরপূর্বক ওষুধ দোকানের গোপন কক্ষে নিয়ে যৌন নিপীড়ন ও ভিডিও ধারণ করা হয়। পরে সেই ভিডিও মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপে ছড়িয়ে দেওয়া হলে বাধ্য হয়ে ওই কিশোর আইনি ব্যবস্থা নেন।
মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে হালিশহর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. ইয়াসিন জানান, অভিযোগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। এদিকে ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত নুর হোসাইন নুরু ও মোয়াজ্জেম আত্মগোপনে থাকায় তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
