নিজস্ব প্রতিবেদক, বাগেরহাট:

বাগেরহাটের শরণখোলায় স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় পরিবেশন করা সেদ্ধ ডিম খেয়ে ১১ জন প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। বুধবার (১ জুলাই) দুপুরে উপজেলার ৯৮ নম্বর পূর্ব ধানসাগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই ঘটনা ঘটে। ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহলের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. প্রিয় গোপাল বিশ্বাস জানান, দুপুরের দিকে ডিম খাওয়ার পরপরই ওই ১১ শিক্ষার্থী পেটব্যথা ও তীব্র শারীরিক অস্বস্তি বোধ করতে শুরু করে।

তাৎক্ষণিকভাবে তাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শেষে বর্তমানে শিক্ষার্থীরা আশঙ্কামুক্ত হলেও সতর্কতাবশত তাদের চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নাসিমা আক্তার দাবি করেন, বিদ্যালয়ের নিজস্ব তত্ত্বাবধানেই ডিম সেদ্ধ করে শিক্ষার্থীদের খাওয়ানো হয়েছিল এবং আপাতদৃষ্টিতে সব ডিমই ভালো ছিল। প্রথম শিফটের শিক্ষার্থীরা একই ডিম খেয়ে সুস্থ থাকলেও, দ্বিতীয় শিফটের কয়েকজন শিক্ষার্থী খাওয়ার পর অসুস্থ হয়ে পড়ে। তবে ঠিক কী কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হলো, তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

এদিকে খাবার সরবরাহকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘ওসাকা’-এর প্রোগ্রাম ম্যানেজার আলিম আল রাজি মুক্তি জানান, উপজেলার ১১৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একই সময়ে একই লটের ডিম সরবরাহ করা হয়েছে। অন্য কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। একটি নির্দিষ্ট বিদ্যালয়ের শিশুরা কেন সাময়িক অসুস্থ হলো, তা তারা খতিয়ে দেখছেন।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মুনির আহমেদ বলেন, “প্রাথমিক অনুসন্ধানে ডিমে কোনো দৃশ্যমান ত্রুটি পাওয়া যায়নি। অনেক সময় একজন শিক্ষার্থী অসুস্থ হলে সহপাঠীদের মধ্যেও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবে (Mass Psychogenic Illness) একই উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে প্রকৃত কারণ উদঘাটনে ডিমের নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।”

সম্পাদকীয় পর্যবেক্ষণ: বারবার খাবারে অসুস্থতা, শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় এক গভীর অশনি সংকেত

স্কুল ফিডিং কর্মসূচির মূল লক্ষ্যই হলো প্রত্যন্ত ও সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলের শিশুদের পুষ্টির চাহিদা মেটানো এবং বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বৃদ্ধি করা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে স্কুল ফিডিং বা মিড-ডে মিলের খাবার খেয়ে শিক্ষার্থীদের অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনা কদিন পর পরই গণমাধ্যমে শিরোনাম হচ্ছে। শরণখোলার এই ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক প্রাথমিক শিক্ষা পুষ্টি কর্মসূচি ব্যবস্থাপনার একটি গভীর ‘অশনি সংকেত’।

 সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারিত্বে পরিচালিত এই বিপুল কর্মযজ্ঞে খাবার সরবরাহ, সংরক্ষণ এবং পরিবেশনের চেইনটিতে যে চরম তদারকির অভাব রয়েছে, তা বারবার প্রমাণিত হচ্ছে। বিশেষ করে ডিম বা দুধের মতো পচনশীল খাবার তীব্র গরমে কীভাবে সংরক্ষিত হচ্ছে, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে।

কোমলমতি শিশুরা যদি পুষ্টির বদলে বিদ্যালয়ে এসে বিষাক্ত বা নিম্নমানের খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে, তবে তা আগামী দিনের শিক্ষা ব্যবস্থাপনার ওপর অভিভাবকদের আস্থা চিরতরে ধূলিসাৎ করে দেবে। এটি শিশুদের মনেও বিদ্যালয় ও পুষ্টি কর্মসূচির প্রতি এক ধরনের স্থায়ী ভীতি ও ট্রমা তৈরি করছে।

 কদিন পর পর এই ধরনের ঘটনা ঘটার পরেও যদি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কিংবা স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে “অন্য কোথাও সমস্যা হয়নি” বা “মানসিক প্রভাব” বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা করা হয়, তবে তা ভবিষ্যৎ শিক্ষানীতির জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনবে।

খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে পুষ্টি কর্মসূচি চালানো প্রকারান্তরে শিক্ষার্থীদের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলার শামিল। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের উচিত অবিলম্বে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কঠোর ফুড-সেফটি প্রোটোকল বাস্তবায়ন করা এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। অন্যথায়, মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণের এই মহৎ উদ্যোগটি ভেস্তে যেতে সময় লাগবে না।

Leave A Reply

যোগাযোগ
ইমেইল: contact@infobangla.news
ওয়েবসাইট: InfoBangla.news

© ২০২৬ InfoBangla.news — সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
InfoBangla.news এ প্রকাশিত সংবাদ, ছবি, ভিডিও বা যেকোনো কনটেন্ট পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার, পুনঃপ্রকাশ বা বিতরণ আইনত দণ্ডনীয়।

Exit mobile version