বিশেষ প্রতিবেদক | ঢাকা, ৩০ জুন ২০২৬
ইতিহাসের এক অদ্ভুত ও নির্মম সমীকরণ দেখল বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন। প্রায় ৫০ বছর আগে তৎকালীন সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউর রহমানের আমলে কারাদণ্ড পেয়েছিলেন জাসদ নেতা হাসানুল হক ইনু। আর আজ, ২০২৬ সালের ৩০শে জুন, সেই জিয়ারই সন্তান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের আমলে আবারও ১০ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলেন এই বর্ষীয়ান রাজনীতিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা।
গত ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট এক গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নির্বাচন-পরবর্তী প্রক্রিয়ায় বর্তমানে বাংলাদেশে ক্ষমতায় রয়েছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। আর এই সরকারের আমলেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে ইনুর বিরুদ্ধে এই প্রহসনের রায় এলো।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার নির্দেশ ও উসকানি দেওয়ার মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই সঙ্গে আদালতের কাঠগড়ায় উপস্থিত থাকা জাসদ সভাপতিকে দুই লাখ টাকা আর্থিক জরিমানা এবং অনাদায়ে আরও সাজার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ইতিহাসের পাতা ও অনুসন্ধান ঘেঁটে দেখা যায়, এর আগে ১৯৭৬ সালে তৎকালীন উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল জিয়াউর রহমানের সরকারের সময় প্রথম কারাদণ্ড ভোগ করেছিলেন হাসানুল হক ইনু। ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বরের সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানের পর জাসদ ও গণবাহিনীর ওপর সামরিক সরকারের ক্র্যাকডাউন শুরু হলে গ্রেপ্তার হন ইনু।
১৯৭৬ সালের জুলাই মাসে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরে গঠিত এক গোপন বিশেষ সামরিক ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে বিচার করা হয় জাসদ নেতাদের। সেই বিচারে কর্নেল আবু তাহেরকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। (যদিও ২০১১ সালে মহামান্য হাইকোর্ট ১৯৭৬ সালের সেই সামরিক আদালত ও বিচারকে সম্পূর্ণ বেআইনি ও অবৈধ ঘোষণা করেন)।
ঠিক ৫০ বছর আগে ১৯৭৬ সালের জুলাই মাসেই জেনারেল জিয়ার সামরিক আদালতের রায়ে ১০ বছরের সাজা পেয়েছিলেন তৎকালীন তরুণ জাসদ নেতা হাসানুল হক ইনু। আর আজ ২০২৬ সালের জুনের শেষ দিনে, জীবনের শেষ অপরাহ্নে এসে, দেশের এক উত্তাল রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সেই জিয়ারই সন্তান তারেক জিয়ার সরকারের সময়ে আবারও ১০ বছরের কারাদণ্ড মাথায় নিয়ে কারাগারে যেতে হচ্ছে এই বর্ষীয়ান রাজনীতিককে।
একই নেতার জীবনে দুই প্রজন্মের দুই সরকারের আমলে সাজা পাওয়ার এই ঘটনাকে দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অন্যতম বিরল ও চমকপ্রদ অধ্যায় হিসেবে দেখছেন

