নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা ও চট্টগ্রাম।

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অপরাধীদের বেপরোয়া হয়ে ওঠার এক ভীতিকর চিত্র ফুটে উঠল চট্টগ্রামের রাউজানে। গত শনিবার দুপুরে রাউজানের পাহাড়তলী ইউনিয়নের চৌমুহনী বাজার এলাকায় প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাকসুদুল হক চৌধুরী মাসুদকে।

সিসিটিভি ফুটেজ দেখে পুলিশ যে পাঁচজন দুর্ধর্ষ অস্ত্রধারীকে শনাক্ত করেছে, স্থানীয় সূত্র ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে তারা সবাই বিএনপির স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত এবং রাউজানের এমপি গিয়াস কাদের চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত।

হত্যাকাণ্ডের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী ও বিএনপি ঘরানার ‘রায়হান গ্রুপ’ এই মিশন বাস্তবায়ন করেছে। চিহ্নিত হওয়া পাঁচ অস্ত্রধারী হলো: মোহাম্মদ ইলিয়াস ওরফে দামা ইলিয়াস (৫টি হত্যাসহ ১৮টি মামলার আসামি),দিদারুল আলম ওরফে দিদার,মোহাম্মদ ইউসুফ (২টি হত্যাসহ ৪টি মামলার আসামি),মোহাম্মদ জাহেদ,মোহাম্মদ আবছার।

ভিডিওতে দেখা যায়, বিএনপির এই ক্যাডারদের মধ্যে ইলিয়াস ও দিদারুল প্রথমে মাকসুদুলকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লে বাকি তিনজন দৌড়ে এসে তাঁর শরীর ঝাঁজরা করে দিয়ে পাহাড়ের গোপন আস্তানার দিকে পালিয়ে যায়।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, হত্যাকাণ্ডের ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত পুলিশ কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি, এমনকি থানায় মামলাও নথিভুক্ত হয়নি। সরকারি দলের ভেতরের কোন্দল বা নিজস্ব নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার কারণেই কি পুলিশি ব্যবস্থা এতটা শ্লথ, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

যদিও চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবদলের সভাপতি হাসান মোহাম্মদ জসিম এবং স্থানীয় এমপি গিয়াস কাদের চৌধুরী দাবি করেছেন, “সন্ত্রাসীদের কোনো দল নেই,” কিন্তু বাস্তবে দাগি অপরাধীদের দলীয় ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার এই পুরনো সংস্কৃতি আবারও প্রমাণিত হলো।

রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে মূলত কর্ণফুলী নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন ও ঘাট নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে কোটি টাকার আধিপত্য বিস্তারই এই হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ বলে এলাকায় জোর আলোচনা চলছে। নিহত মাকসুদুল রাঙ্গুনিয়ার চম্পাতলী ঘাট এবং রাউজানের খেলার ঘাট এলাকার দুটি বড় বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ করতেন। সেই বালু সাম্রাজ্য নিজেদের কবজায় নিতেই দলীয় প্রতিপক্ষকে এভাবে সরিয়ে দেওয়া হলো বলে স্থানীয়দের ধারণা।

রাউজানে প্রকাশ্য দিবালোকে যুবদল নেতাকে নিজ দলেরই ক্যাডারদের হাতে খুন হওয়ার এই ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন চিত্র নয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে দেশজুড়ে এক ধরনের ‘খুনের মহোৎসব’ শুরু হয়েছে, যা বর্তমান ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে উলঙ্গ করে দেখায়।

স্থানীয়দের মতে, রাউজানের পাহাড়তলী, কদলপুর ও পৌরসভা এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে যত খুন ও গোলাগুলি হয়েছে, তার মূল হোতারা মিশন শেষে পাহাড়ের দুর্গম আস্তানায় আশ্রয় নেয়। পুলিশ প্রশাসন এই দুর্গম আস্তানাগুলো গুঁড়িয়ে দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।

দেশের প্রতিটি কোণায় এখন অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি। রাউজানের ঘটনায় পাঁচ অস্ত্রধারীর বিরুদ্ধে ডজন ডজন হত্যা মামলা থাকা সত্ত্বেও তারা কীভাবে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায় এবং বুক ফুলিয়ে খুন করে পালিয়ে যায়, তা প্রশাসনের চরম ব্যর্থতা। পুলিশের গৎবাঁধা বক্তব্য এখন অপরাধীদের আরও বেশি সাহস জোগাচ্ছে।

যখন কোনো অপরাধী গোষ্ঠী সরাসরি ক্ষমতাসীন বা প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের তকমা গায়ে লাগিয়ে ঘোরে, তখন স্থানীয় প্রশাসন তাদের ঘাঁটানোর সাহস পায় না। রাউজানের ঘটনা প্রমাণ করে, অপরাধীরা দলীয় পরিচয়কে বর্ম হিসেবে ব্যবহার করে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে।

হাট-বাজার কিংবা রাজপথ—কোথাও এখন নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা নেই। প্রকাশ্য দিবালোকে খুনের পর ২৪ ঘণ্টায়ও মামলা না হওয়া প্রমাণ করে, বিচারব্যবস্থা ও আইনি প্রক্রিয়া কতটা স্থবির ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।

গতকাল রবিবার বিকেলে নিহত যুবদল নেতা মাকসুদুলের জানাজায় মানুষের ঢল নামে। স্বজন ও সাধারণ মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়েন। নিহতের বড় ভাই পেয়ারুল হক চৌধুরী স্বপন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার ভাইয়ের কোনো ব্যক্তিগত শত্রু ছিল না। জনপ্রিয়তাই কি তার কাল হলো? সিসিটিভি ফুটেজে খুনিদের স্পষ্ট চেনার পরও পুলিশ কেন কাউকে ধরতে পারল না?”

Leave A Reply

যোগাযোগ
ইমেইল: contact@infobangla.news
ওয়েবসাইট: InfoBangla.news

© ২০২৬ InfoBangla.news — সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
InfoBangla.news এ প্রকাশিত সংবাদ, ছবি, ভিডিও বা যেকোনো কনটেন্ট পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার, পুনঃপ্রকাশ বা বিতরণ আইনত দণ্ডনীয়।

Exit mobile version