নিজস্ব প্রতিবেদক, পটুয়াখালী:
মহিপুরের প্রশাসনিক ভবিষ্যৎ ও উপজেলা গঠন নিয়ে কথা বলায় এক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিককে ফেসবুকে প্রকাশ্য ‘গণধোলাই’ দেওয়ার হুমকিকে কেন্দ্র করে উত্তাল হয়ে উঠেছে গোটা উপকূলীয় অঞ্চল।
বাংলাভিশন টেলিভিশনের সিনিয়র সাংবাদিক বদরুল আলম নাবিলকে দেওয়া এই হুমকির পর স্থানীয় সচেতন মহল, ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। ঘটনার নেপথ্যে থাকা অভিযুক্ত নেতার অতীতের নানা ‘অন্ধকার’ কর্মকাণ্ড নিয়ে এখন এলাকা জুড়ে বইছে সমালোচনার ঝড়।
অভিযোগ উঠেছে, মহিপুর থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের প্রভাবশালী নেতা পরিচয়দানকারী মো. আল-আমিন হাওলাদার মামুন ওরফে কালা মামুন তার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি থেকে সাংবাদিক নাবিলকে টার্গেট করে একটি উসকানিমূলক পোস্ট দেন। অত্যন্ত আপত্তিকর ভাষা ব্যবহার করে সেই পোস্টে বলা হয়, সাংবাদিক নাবিলকে মহিপুর সদরে দেখা মাত্রই যেন ‘গণধোলাই’ দেওয়া হয়।
একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিককে এভাবে প্রকাশ্য দিবালোকে পিটিয়ে মারার প্রচ্ছন্ন হুমকি দেওয়ার পর থেকেই মহিপুরের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে।
সম্প্রতি মহিপুর অঞ্চলের প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ও ‘কুয়াকাটা’ নামে নতুন উপজেলা গঠনের যৌক্তিকতা নিয়ে গঠনমূলক কলাম ও বক্তব্য তুলে ধরেন সাংবাদিক বদরুল আলম নাবিল। যেখানে তিনি প্রশাসনিক অফিস মহিপুরে স্থাপনের যৌক্তিক দাবি জানান। এই যৌক্তিক মতামতের পরই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন কালা মামুন।
তবে স্থানীয়দের দাবি, ঘটনা কেবল উপজেলা গঠন নিয়ে নয়; এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো উদ্দেশ্য। ঘটনার পর সাংবাদিক বদরুল আলম নাবিল তার ফেসবুক আইডিতে এক বিস্ফোরক ও চ্যালেঞ্জিং জবাব দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট মনে করিয়ে দেন, ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী সময়ে মহিপুর বাজারের পুনর্বিন্যাস এবং প্রকৃত ব্যবসায়ীদের নামে দোকান বরাদ্দ প্রক্রিয়ায় তিনি অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন, যেখানে কোনো অন্যায়ের ঠাঁই ছিল না। নাবিল উল্টো চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে লিখেছেন,
”কোথায় এবং কবে আমাকে ‘গণধোলাই’ দেওয়া হবে, সেই সময় ও স্থান জানানো হলে আমি নিজেই সেখানে উপস্থিত হতে প্রস্তুত আছি।”
তিনি আরও জানান, ব্যক্তিগতভাবে এই অভিযুক্তকে তিনি চেনেনই না।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অভিযুক্ত কালা মামুনের বিরুদ্ধে এলাকায় রয়েছে বিস্তর অভিযোগ।
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মহিপুর বাজারে জবরদখল, ফুটপাতে ‘চৌকি বাণিজ্য’ এবং নানা ধরনের চাঁদাবাজি ও অনিয়মের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা নিয়ে স্থানীয় মহলে রয়েছে তীব্র অসন্তোষ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একাধিক ব্যবসায়ী জানান, রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল বানিয়ে এই চক্রটি পুরো বাজার এলাকায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে।
হুমকির এই চাঞ্চল্যকর ঘটনা প্রসঙ্গে মহিপুর থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
”এই মামুন বর্তমানে দলের কোনো অফিশিয়াল কমিটিতে নেই। তবে সে স্থানীয় একজন প্রভাবশালী নেতার ছত্রছায়ায় থেকে এসব বেপরোয়া কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে বলে আমরাও শুনেছি। দলের নাম ভাঙিয়ে কেউ যদি কোনো অনৈতিক বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে, তবে দল তার দায় নেবে না।”
এদিকে ঘটনাটি কেন্দ্র করে ঢাকার সাংবাদিক মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। জানা গেছে, ঢাকায় কর্মরত গণমাধ্যমকর্মীরা এই হুমকির প্রতিবাদে জাতীয় পর্যায়ে বড় ধরনের আন্দোলনের ডাক দেওয়ার প্রস্তাব করেছিলেন। তবে সাংবাদিক বদরুল আলম নাবিল নিজেই তাতে সায় দেননি।
নাবিল জানান, বিষয়টি জাতীয়ভাবে বড় আকার ধারণ করলে মহিপুর ও কুয়াকাটা অঞ্চলের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হবে। তাছাড়া, একজন কম বয়সী যুবকের ভবিষ্যৎ নষ্ট হোক—তাও তিনি চান না। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন, সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল ও প্রশাসন দ্রুত এর বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেবে।
এই ঘটনার পর থেকে মহিপুরের গণমাধ্যমকর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। যেকোনো সময় বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও দ্রুত হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছে স্থানীয় সচেতন মহল।
