বিশেষ প্রতিবেদক | ২২ মে ২০২৬
বাংলাদেশে কন্যাশিশুদের নিরাপত্তা এক ভয়াবহ সংকটের মুখে। সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা শুধু সংখ্যায় বাড়ছে না, বরং এর ধরনও হয়ে উঠেছে অত্যন্ত নৃশংস। গত চার মাসে দেশে ১১৮ জন কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে চলতি বছরের মে মাসের প্রথম ২০ দিনেই ধর্ষণের শিকার হয়েছে ২৪ জন।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত ১১৮ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। একই সময়ে ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে ৪৬ জন। শুধু গত দুই সপ্তাহে ধর্ষণের পর চার শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সাড়ে চার মাসে ১১৫ জন শিশু হত্যার শিকার হয়েছে বলে জানা গেছে। পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ৫ হাজার ৯৫৮টি মামলা হয়েছে, যা সামাজিক নিরাপত্তার নাজুক অবস্থাকেই নির্দেশ করে।
বিশ্লেষকরা এই ভয়াবহতার পেছনে একক কোনো কারণ দেখছেন না। অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে:
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয়: নৈতিক শিক্ষার অভাব এবং বিকৃত অনলাইন কনটেন্টের সহজলভ্যতা অপরাধ প্রবণতাকে উসকে দিচ্ছে।
মাদকাসক্তির বিস্তার:মাদকাসক্তরা প্রায়ই এই ধরনের জঘন্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা: অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি এবং বিচার প্রক্রিয়ায় বিলম্ব অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলেছে।
অপরাধের ধরন পরিবর্তন: ভুক্তভোগী অপরাধীকে চিনে ফেলায় বা সাক্ষ্য দিতে পারে– এমন আশঙ্কায় অপরাধীরা এখন ধর্ষণের পর শিশুকে হত্যা করাকেই নিরাপদ মনে করছে।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, “এটি কেবল যৌন সহিংসতা নয়, বরং একটি বহুমাত্রিক সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংকট। অপরাধ দমনে রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টা জরুরি।”
সাবেক জেলা জজ ইকতেদার আহমেদ আইনের প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, “আইনের অভাব নেই, অভাব তদন্তের সক্ষমতা ও স্বচ্ছতার। মামলার তদন্তে গাফিলতি এবং বিচারক-মামলার সংখ্যার অসামঞ্জস্য ন্যায়বিচার প্রাপ্তিকে দীর্ঘায়িত করছে।”
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদের মতে, মানুষের মানবিক গুণাবলির চর্চা কমে যাওয়ায় পাশবিক প্রবৃত্তি প্রাধান্য পাচ্ছে। শিশুদের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে অপরাধীরা জঘন্য এই পথ বেছে নিচ্ছে।
পুলিশ সদরদপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি বলেন, “দ্রুত ও সঠিক তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে এবং মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়টি নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে।”
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, শিশু যদি ঘরে-বাইরে কোথাও নিরাপদ না থাকে, তবে সেই সমাজ কখনোই নিরাপদ নয়। সংবিধান ও আন্তর্জাতিক সনদে শিশুদের সুরক্ষার যে অঙ্গীকার রয়েছে, তার কঠোর বাস্তবায়ন প্রয়োজন। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি শক্তিশালী সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারলে এই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হয়ে পড়বে।

