নিজস্ব প্রতিনিধি :

অবশেষে শেখ হাসিনার করা আশঙ্কাই যেন বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে  বঙ্গোপসাগর ও বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের কৌশলের অংশ হিসেবে মার্কিন যুদ্ধজাহাজের জন্য বাংলাদেশের নৌবন্দর উন্মুক্ত  করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচিত কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তি ACSA ও GSOMIA চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনার খবর দেশ-বিদেশে আলোচনা সৃষ্টি করেছে। 

নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই ধরনের চুক্তির আওতায় মার্কিন যুদ্ধজাহাজ বা সামরিক বিমানকে বাংলাদেশের বন্দর ও ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হলে স্বল্পমেয়াদে কিছু অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদে দেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান জটিল হয়ে উঠতে পারে। তাদের আশঙ্কা, এতে বাংলাদেশ আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে চলে যেতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতি “সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়”  এমন চুক্তির ফলে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। কারণ, বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা ক্রমেই বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশকে একটি নির্দিষ্ট কৌশলগত বলয়ের অংশ হিসেবে দেখা হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও কিছু উদ্বেগ সামনে আসছে। চীন দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্প বিনিয়োগ ও সামরিক সরঞ্জাম খাতে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। বিশ্লেষকদের একাংশের ধারণা, নতুন সামরিক সমঝোতা বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও এ ধরনের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া নিয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক অবস্থান প্রকাশ পায়নি।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশি সামরিক বাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি প্রবেশাধিকার জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্থাপনার বিষয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে কোনো আন্তর্জাতিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র জড়িয়ে পড়লে বাংলাদেশের ভূ-অবস্থান কৌশলগত কারণে বাড়তি গুরুত্ব পেতে পারে, যা ঝুঁকিও বাড়াতে পারে বলে মত দিয়েছেন কেউ কেউ।

আঞ্চলিক কূটনীতির ক্ষেত্রেও নতুন ভারসাম্যের প্রয়োজন হতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র এই তিন শক্তির স্বার্থ বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে জড়িত থাকায় বাংলাদেশের যেকোনো সামরিক সহযোগিতা চুক্তি প্রতিবেশী সম্পর্ক ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশ্লেষকদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, অর্থনৈতিক সুবিধা বা বাণিজ্যিক স্বার্থের বিনিময়ে কোনো পরাশক্তির সঙ্গে অতিরিক্ত কৌশলগত নির্ভরতা তৈরি হলে ভবিষ্যতে নীতিগত স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকতে পারে। তাদের মতে, জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক শান্তির বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে এমন চুক্তির প্রতিটি ধারা গভীরভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

তবে সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, আলোচিত বিষয়গুলোর অনেকটাই সম্ভাব্য প্রভাবভিত্তিক বিশ্লেষণ। চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্ত ও বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে চূড়ান্ত মূল্যায়নে পৌঁছানো কঠিন।

Leave A Reply

Exit mobile version