মধ্যবিত্তের পকেটে টান: রাজধানীসহ দেশজুড়ে সবজি ও ডিমের বাজারে নতুন আগুন!
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
সপ্তাহের ব্যবধানে রাজধানীসহ সারা দেশের কাঁচাবাজারে যেন আগুন লেগেছে! প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। চাল, ডাল, তেলের ঊর্ধ্বগতির পর এবার নতুন করে অস্থিরতা শুরু হয়েছে সবজি ও ডিমের বাজারে। ফলে নিত্যদিনের বাজার করতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ ও নিম্নআয়ের মানুষ। বাজারে গিয়ে পকেটের হিসাব মেলাতে না পেরে খালি হাতে কিংবা আধা-খালি ব্যাগ নিয়ে ঘরে ফিরছেন মধ্যবিত্তরা।
শুক্রবার রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মিরপুর, মহাখালী ও সূত্রাপুরসহ বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, বেশিরভাগ সবজির দামই এখন সেঞ্চুরি (১০০ টাকা) পার করেছে। কেজিপ্রতি সবজি বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১২০ টাকার আকাশছোঁয়া দামে।
এক নজরে আজকের বাজারের দরদাম: গোল বেগুন ও কাঁকরোল ১২০ টাকা (প্রতি কেজি),লম্বা বেগুন, শসা, করলা, ঝিঙ্গা, চিচিঙ্গা ও পেঁপে ১০০ টাকা (প্রতি কেজি),গাজর ১২০ টাকা (প্রতি কেজি),
বরবটি ও পটোল ৮০ টাকা (প্রতি কেজি), কাঁচা মরিচ ১৬০ টাকা (প্রতি কেজি),লাউ ১০০ টাকা (প্রতি পিস),জালি কুমড়া ৭০ টাকা (প্রতি পিস)
সবজির পর মধ্যবিত্তের প্রোটিনের শেষ ভরসা ডিমের বাজারেও লেগেছে বড় ধাক্কা। গত সপ্তাহের তুলনায় ফার্মের মুরগির ডিমের দাম ডজনপ্রতি একলাফে ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। বাজারে প্রতি ডজন ডিম এখন বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকায়। সাধারণ ক্রেতাদের প্রশ্ন— “সবজি আর ডিমের দাম যদি এভাবে বাড়ে, তবে মানুষ খাবে কী?”
দেশজুড়ে নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির ভয়াবহতা এক নীরব দুর্ভিক্ষ! সারাদেশে যেভাবে একের পর এক নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে, তা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে এক চরম বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এই ঊর্ধ্বগতির ভয়াবহতা আজ সমাজের প্রতিটি স্তরে ক্ষত তৈরি করছে পুষ্টিহীনতার চরম ঝুঁকি: মাছ-মাংসের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে অনেক আগেই। এখন ডিম ও সবজির দামও সাধারণের সাধ্যের বাইরে চলে যাওয়ায় নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো পুষ্টিহীনতার চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। বিশেষ করে শিশু ও গর্ভবতী নারীদের প্রয়োজনীয় প্রোটিন ও ভিটামিনের জোগান দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
আয়ের সাথে ব্যয়ের কোনো মিল নেই। সাধারণ চাকুরিজীবী ও দিনমজুররা বাধ্য হয়ে তাদের চিকিৎসা, সন্তানের পড়াশোনা এবং অন্যান্য জরুরি খরচ কমিয়ে খাবারের পেছনে ব্যয় করছেন। এটি একটি পরিবারের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং সমাজে মানসিক অশান্তি ও পারিবারিক কলহ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
মাসের অর্ধেক পার হতেই অনেকের পকেট খালি হয়ে যাচ্ছে। ফলে চাল-ডাল আর নিত্যপণ্য কিনতে সাধারণ মানুষকে চড়া সুদে ঋণ নিতে হচ্ছে কিংবা সঞ্চয় ভাঙতে হচ্ছে।
বাজার করতে আসা ক্ষুব্ধ ক্রেতাদের অভিযোগ, বাজারে সরকারের কোনো কার্যকর তদারকি বা মনিটরিং নেই। সিন্ডিকেট চক্র ও অসাধু ব্যবসায়ীরা ইচ্ছেমতো দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে।
“বাজারে ১০০ টাকার নিচে কোনো সবজি নেই। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। এভাবে চললে না খেয়ে মরা ছাড়া উপায় নেই।”— বাজারে আসা এক বেসরকারি চাকরিজীবী।
তবে বরাবরের মতোই দায় এড়ানোর চেষ্টা করছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি— দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উৎপাদন ও সরবরাহের ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে পরিবহন খরচ আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে পাইকারি ও খুচরা বাজারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাজার নিয়ন্ত্রণে এখনই যদি প্রশাসন কঠোর পদক্ষেপ না নেয়, তবে এই মূল্যস্ফীতির ধাক্কায় দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারে। সাধারণ মানুষের জীবন বাঁচাতে বাজার সিন্ডিকেট ভাঙা এবং কঠোর বাজার মনিটরিংয়ের কোনো বিকল্প নেই।

