নিজস্ব প্রতিবেদক, দিনাজপুর | ১০ মে, ২০২৬
নিজস্ব প্রতিবেদক, দিনাজপুর | ১০ মে, ২০২৬
সাপে কাটার পর দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল জুলেখা খাতুনকে (৫৫)। সাথে ছিল কামড় দেওয়া সেই সাপটিও। হাসপাতালে পর্যাপ্ত ‘অ্যান্টিভেনম’ মজুত থাকলেও মেলেনি চিকিৎসা। এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ঘোরার ক্লান্তিকর পথেই নিভে গেল প্রাণপ্রদীপ। চিকিৎসকদের অবহেলা আর আইসিইউ সংকটের অজুহাতে এভাবেই অকালে ঝরে গেলেন দিনাজপুরের বোচাগঞ্জের এক গৃহবধূ।
ঘটনার সূত্রপাত
গত শুক্রবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বোচাগঞ্জ উপজেলার রনগাঁও ইউনিয়নের চণ্ডীপুর গ্রামে নিজ বাড়ির গোলাঘরে সাপের কামড়ের শিকার হন জুলেখা খাতুন। স্বজনরা কালক্ষেপণ না করে তাঁকে উদ্ধার করে দ্রুত বোচাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে তাঁর রক্ত পরীক্ষাও করা হয়। চিকিৎসকরা নিশ্চিত হন সাপে কাটার বিষয়ে এবং হাসপাতালে অ্যান্টিভেনম মজুত থাকার কথা জানান।
চিকিৎসা না দিয়ে রেফার: স্বজনদের ক্ষোভ
জুলেখার ছেলে আবদুল হান্নান অভিযোগ করেন, হাসপাতালে ভ্যাকসিন থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসকরা তা প্রয়োগ করেননি। আইসিইউ সাপোর্ট লাগবে-এমন অজুহাতে রোগীকে। দনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়।
সেখানকার পরিস্থিতি ছিল আরও ভয়াবহ। দিনাজপুর মেডিকেলের জরুরি বিভাগে নেওয়ার পর নার্সরা জানান, আইসিইউ বেড খালি নেই। মুমূর্ষু অবস্থায় জুলেখাকে বেসরকারি ক্লিনিকে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। ততক্ষণে তাঁর মুখ দিয়ে ফেনা বের হতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
বোচাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বিজয় কুমার রায় জানান:
“হাসপাতালে বর্তমানে ৪০ ভায়েল অ্যান্টিভেনম আছে। রক্ত পরীক্ষায় প্রাথমিকভাবে সংক্রমণ ধরা না পড়লেও ভ্যাকসিন পরবর্তী আইসিইউ সাপোর্টের কথা ভেবেই রোগীকে মেডিকেলে পাঠানো হয়েছিল।”
অন্যদিকে, জেলা সিভিল সার্জন আসিফ ফেরদৌস অ্যান্টিভেনম মজুত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ওই রোগীর মৃত্যু ও ভ্যাকসিন না পাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে।
পরিসংখ্যান ও বর্তমান পরিস্থিতি
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত এক বছরে দিনাজপুরের বিভিন্ন উপজেলায় সাপের কামড়ে অন্তত ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে এর কোনো সঠিক পরিসংখ্যান সংরক্ষিত নেই।
তদন্তের আশ্বাস:
বোচাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মারুফ হাসান বলেন, “হাসপাতালে সরকারি বরাদ্দ থেকে অ্যান্টিভেনম কিনে দেওয়া হয়েছে। মজুত থাকা সত্ত্বেও কেন রোগীকে তা দেওয়া হবে।” *, তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া
জুলেখার মৃত্যুতে তাঁর পরিবারে চলছে শোকের মাতম। বড় মেয়ে সুমী আক্তার মায়ের শোকে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন-হাসপাতালে ওষুধ ও সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যদি রোগীকে রেফার করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়, তবে প্রান্তিক মানুষের চিকিৎসার ভরসা কোথায়?
