ডেস্ক রিপোর্ট :
“রাখাইন করিডোর” ইস্যু কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই “ইকোনমিক করিডোর” নিয়ে চিন্তা করছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী দল। বাস্তবতা কি হতে পারে এই নিয়েই চলছে অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নানান আলোচনা-সমালোচনা।
বাংলাদেশে একটি বিশাল অর্থনৈতিক করিডোর নির্মাণের চিন্তা করছে বর্তমান সরকার যার একমাত্র অর্থ যোগানদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে চাচ্ছেন The Asian Development Bank বা ADB কে। যার আনুমানিক ব্যয় হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে প্রায় ৭৯ বিলিয়ন ডলার।
এই “ইকোনমিক করিডোর”-এ যারা অর্থ যোগান দিবে তারা আসলে কারা? এমন প্রশ্ন আসতেই পারে, বিশ্ব ব্যাংক-এর মত প্রতিষ্ঠান কে টেক্কা দিয়ে বাংলাদেশের মত একটা দেশকে এত টাকা বিনিয়োগের মূল লক্ষ কি? এটাই জানতে চান বিশেষজ্ঞরা।
The Asian Development Bank (ADB) হলো একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা, যার সদর দপ্তর ফিলিপাইনের ম্যানিলায়। ১৯৬৬ সাল থেকেই প্রতিষ্ঠানটি এশিয়ার দেশগুলোকে ঋণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে থাকে তারা। ১৯৭৩ সাল থেকে বাংলাদেশের সাথে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি, এবং ২০২৬ সাল পর্যন্ত গত ৫৩ বছরে বিভিন্ন খাতে আলাদা ভাবে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে এবারের টাকার সংখ্যাটা অনেক বেশী ও এত ব্যয়বহুল মেগা প্রজেক্টে অনভিজ্ঞ সরকারকে তারা কি আসলেই ভরসা করবে? এমন যুক্তিও দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া পর্যন্ত প্রায় ৯৯০ কিলোমিটার রাস্তা, রেল, শিল্প এলাকা, বিদ্যুৎ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সবকিছু একসাথে উন্নয়ন। যা বাস্তবিক ভাবে অনেকটাই সময় সাপেক্ষে ও ব্যয়বহুল। ইতিমধ্যে একই রাস্তায় ৪ লেন ও ২ লেন বিশিষ্ট রাস্তা, বহু ইকোনমিক জোন, ৪ লেন বিশিষ্ট রেললাইন, মেঘনা সেতু ও রেল লাইন, সোলার পাওয়ার প্লান্ট, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র সহ ইত্যাদি রয়েছে। যার ফলে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মত বড় অর্থনৈতিক অঞ্চলে চাপ কমেছে, কয়েক কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। বিগত সরকারের মেগা প্রজেক্টে সেগুলো ইতিমধ্যে দেশবাসীর কাছে পরিষ্কার হয়েছে।
৩ ধাপে প্রস্তাবিত এই প্রজেক্টে কোন ভাবে যদি প্রজেক্ট বাস্তবায়নে বাধাগ্রস্ত হয় তাহলে ঋণ কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হবে। প্রথম ৩ বছরে ২০ বিলিয়ন ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব করা হলেও এই টাকায় কি করবে সরকার? কক্সবাজার থেকে বগুড়া পর্যন্ত মহাসড়কে হাত দেওয়ার তেমন জায়গা নেই, কক্সবাজার থেকে গাজীপুর অথবা টাঙ্গাইল পর্যন্ত রেললাইনেরও তেমন বড় কোন কাজের প্রয়োজন নেই বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। এদিকে সিরাজগঞ্জে ২০০ ওয়াটের বড় একটি সোলার প্যানেল প্রজেক্ট আছে যা জাতীয় গ্রীডে ৮০০ থেকে ১০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করে আসছে ও পাবনায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে চলতি বছরের আগস্ট থেকে প্রথম ধাপে ৮০০-৮৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রীডে যুক্ত হবে। তাহলে এই অঞ্চলগুলোতে মেগা প্রজেক্ট নিতান্তই অর্থের অপচয় বলে ধারনা করছেন অনেকেই।
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রজেক্টে কাজ করলে বাংলাদেশ বিশাল ঋণের চাপ নিয়ে চলতে হবে। ঋণের টাকা পরিশোধ করতে দ্রব্য মূল্যের দাম, জ্বালানির দাম সহ সকল কিছুর দাম বাড়ার শঙ্কা রয়েছে। ৭৯ বিলিয়ন ডলারের সুদ সহ ঋণের পরিমাণ কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। বাংলাদেশে বড় প্রকল্পে বাজেট বাড়া ও অনিয়ম এর গল্প নতুন নয় দূর্নীতি ও অপচয়ের আশংকা করা কোন ভাবেই ফেলে দেওয়ার মত নয়। তাছাড়া এই প্রজেক্টে হাত দিলে বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চল (টেকনাফ, বনাঞ্চল) ক্ষতিগ্রস্ত হবে যা প্রাকৃতিক দূর্যোগ মোকাবেলায় বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে। এত লম্বা রাস্তায় দক্ষিণ এশিয়ার মাঝে চীন আর ভারত ছাড়া কারো কাজ করার কোন অভিজ্ঞতা নেই। তাছাড়াও প্রজেক্ট চলাকালীন সময় যানজট ও বানিজ্যিক ট্রান্সপোর্ট ও চলাচলে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে।
এখানে বাস্তব কথা বলতে হবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মেট্রোরেল, পদ্মা সেতু, এক্সপ্রেসওয়ে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র সহ বড় স্কেলের মাল্টি-সেক্টর করিডোর একসাথে করার অভিজ্ঞতা এই সরকারের একেবারেই নেই। তাই পর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনার ঘাটতি হলেই প্রজেক্ট হাত ছাড়া হয়ে যাবে, যার জন্য এই ঋণের বোঝা পুরোটাই জনগণের ট্যাক্সের টাকায়ই পরিষোধ করতে হবে।
যেখানে বিগত ২০ মাসে বিশ্ব ব্যাংক কিংবা IMF এর মত প্রতিষ্ঠান ১ বিলিয়ন ডলার ঋণ দেয়নি সেখানে বাংলাদেশকে অপরিকল্পিত ও অনিশ্চিত প্রজেক্টের নামে একটা “ঋণের ফাঁদে” ফেলে অনভিজ্ঞ সরকারের এমন প্রজেক্টের কাজের চিন্তা মোটেও উচিত হবে না বলে দাবি করছেন বিশ্লেষকরা।
এটা এখনো ঘোষিত প্রজেক্ট না, প্রস্তাব মাত্র। সময়ের সাথে আলোচনা ও বাস্তব দৃষ্টিকোণ থেকে সরকার এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সব মিলিয়ে ৭৯ বিলিয়ন টাকা না এখানে ৭৯ বিলিয়ন ডলার (অনেক বড় অঙ্ক)। ছোট্ট একটা ভুলে বাংলাদেশ পড়বে বড় বিপদে ও বড় ঋণের নিচে।
