নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
বাংলাদেশে বর্তমান হাম মহামারির পেছনে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত ভুল এবং টিকা ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়াকে দায়ী করছে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহল। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সাইন্স’ (Science)-এর এক সাম্প্রতিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর টিকা সংগ্রহ পদ্ধতিতে অদূরদর্শী পরিবর্তনের কারণেই আজ দেশজুড়ে এই ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে টিকার সফল হার ৯৫% থেকে নাটকীয়ভাবে নেমে বর্তমানে ৫৮% এ দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে ইউনিসেফের মাধ্যমে পরিচালিত টিকা সরবরাহ ব্যবস্থা বাতিল করে ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার ‘ওপেন টেন্ডার’ পদ্ধতি চালু করলে পুরো সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়ে এবং দেশে টিকার তীব্র সংকট দেখা দেয়। ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুরজাহান বেগমকে এই সিদ্ধান্তের ব্যাপারে কঠোরভাবে সতর্ক করলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০২৪ সালে নির্ধারিত হাম-রুবেলা (এমআর) ক্যাম্পেইনটি ২০২৫ সালে পিছিয়ে দিয়েও শেষ পর্যন্ত তা বাতিল করা হয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মাত্র ৫৯% শিশু টিকার আওতায় এসেছে—যা পরবর্তীতে নিজেদের অক্ষমতা ঢাকতে সরকারি ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে ফেলা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমানে দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫৮টিতেই হাম ছড়িয়ে পড়েছে এবং ২১ হাজারের বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এই পরিস্থিতিকে বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচির বড় ধরনের ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আইইডিসিআরের সাবেক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এএসএম আলমগীর জানান, দেশে শিশুদের অপুষ্টির হার এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ভিটামিন এ কর্মসূচি কয়েক দফা বন্ধ থাকা এই মৃত্যুঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
এই সংকট নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। সংসদের এক প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, এই দায়ের অংশীদার আগের সরকার ও অন্তর্বর্তী সরকার উভয়ই। অন্যদিকে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘সাইন্স’-কে দেওয়া এক ইমেইল বার্তায় জানান, তাঁর শাসনামলে টিকাদানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল বলেই কোনো বড় প্রাদুর্ভাব ঘটেনি। টিকা ক্রয় প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী বিপ্লব কুমার দাস ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ দাখিল করেছেন। ইউনিসেফ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্সও এই ক্রয় ব্যবস্থার পরিবর্তন নিয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তবে বর্তমান স্বাস্থ্য উপদেষ্টা সায়েদুর রহমান দাবি করেছেন, স্বচ্ছতা ও নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থা গড়ার লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অতিদ্রুত জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই মহামারি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

