ফেব্রুয়ারি ২, ২০২৬ •

বিশেষ প্রতিবেদক

মার্কিন বিচার বিভাগ (ডিওজে) সম্প্রতি কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইন সংক্রান্ত বিপুল পরিমাণ নথি প্রকাশ করেছে। প্রকাশিত এসব নথিতে এপস্টেইনের শিশু পাচার ও যৌন নিপীড়ন চক্রের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ উইলিয়াম ব্লেইন রিচার্ডসনের নাম উঠে এসেছে। একই সঙ্গে উঠে এসেছে বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ও ফেনী-৩ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আব্দুল আওয়াল মিন্টুর নাম, যিনি রিচার্ডসনের একটি নির্বাচনী ক্যাম্পেইনে অনুদান দিয়েছিলেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিসের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০০৬ সালে নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের গভর্নর নির্বাচনে দ্বিতীয় মেয়াদে অংশ নেন রিচার্ডসন এবং সে নির্বাচনে বিজয়ী হন। ওই নির্বাচনী ক্যাম্পেইনের অনুদানদাতাদের তালিকা সংবলিত EFTA02729080 শিরোনামের একটি ফাইল পাওয়া যায়।

২০০৬ সালের ৭ই মার্চ প্রস্তুত করা ফাইলটির ২৬ নম্বর পৃষ্ঠায় উল্লেখ রয়েছে, বাংলাদেশি ব্যবসায়ী আব্দুল আওয়াল মিন্টুর কাছ থেকে রিচার্ডসন ৫ হাজার ডলার অনুদান গ্রহণ করেন। একই ক্যাম্পেইনের জন্য জেফরি এপস্টেইনের কাছ থেকে তিনি পান ৫০ হাজার ডলার অনুদান।

ফাইলে দাতার নাম-পরিচয় উল্লেখ করা হয়েছে এভাবে- Abdul A. Mintoo, Dhaka. পরিচিতি বলা হয়েছে, বাংলাদেশি ব্যবসায়ী।

আব্দুল আওয়াল মিন্টু- নাম এসেছিল তার মানি লন্ডারিং কেলেঙ্কারির আন্তর্জাতিক নথিপত্রেও

বেনামে অর্থ পাচারের মাধ্যমে অর্থ পাচারে জড়িত বিশ্বের বড় বড় দেশের প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, আমলা ও ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণির ব্যক্তিবর্গের তালিকা উন্মোচিত হয়েছিল ২০১৭ সালে। একদল অনুসন্ধানী সাংবাদিকের তদন্তে উঠে আসা সেই প্যারাডাইস পেপারসের তালিকায় সেসময় উঠে এসেছিল বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও ব্যবসায়ী নেতা আবদুল আউয়াল মিন্টুর নাম। এনএফএম এনার্জি লিমিটেড নামের বারমুডায় নিবন্ধিত একটি কোম্পানির শেয়ারধারী হিসেবে তার নাম এ তালিকায় রয়েছে। এনএফএম এনার্জির শেয়ারধারী হিসেবে আবদুল আউয়াল মিন্টুর স্ত্রী নাসরিন ফাতেমা আউয়ালের নামও আছে। নথিতে বাংলাদেশের ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে ঢাকার বীর উত্তম সি আর দত্ত রোডের অ্যাংকর টাওয়ারে অবস্থিত মাল্টিমোড লিমিটেড।

এ ছাড়া প্যারাডাইস পেপারসে আবদুল আউয়াল মিন্টুর ছেলে তাবিথ আউয়াল, তাফসির মোহাম্মদ আউয়াল ও তাজওয়ার মোহাম্মদ আউয়ালের নামও রয়েছে।

এখানেই শেষ নয়। ২০২১ সালে এমনই আরেরক অর্থ পাচারের নথি উন্মুক্ত হয়, যার নাম- প্যানডোরা পেপারস। সেখানেও উঠে এসেছে মিন্টু পরিবারের নাম। নেপালের শীর্ষ ধনী ও কুখ্যাত ব্যবসায়ী বিনোদ চৌধুরীর সাথে ব্যবসায়ে জড়িত থাকায় প্যানডোরা পেপারসে নাম আসে আব্দুল আউয়াল মিন্টুর। এখানে তার পরিচয় বলা হয়েছে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক। ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টস (আইসিআইজে) বিশ্বের বিখ্যাত রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের আর্থিক কেলেংকারির তালিকা প্রকাশ করে।

প্যানডোরা পেপারসে উঠে আসে বিনোদ চৌধুরীর সাথে বিএনপি নেতা মিন্টুর ব্যবসায়িক লেনদেনের তথ্যও। ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডে চৌধুরী কোম্পানির প্রতিষ্ঠানের অংশীদার হিসেবে যাদের নাম পাওয়া গেছে, তাদের মধ্যে আব্দুল আউয়াল মিন্টু একজন। বিশ্বের কয়েকটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম প্রায় ১১৭টি দেশের ১ কোটি ১৯ লাখ নথি বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য প্রকাশ করে।

রিচার্ডসনের পরিচয়

২০২৩ সালে মারা যাওয়া উইলিয়াম ব্লেইন রিচার্ডসন ছিলেন এক মার্কিন রাজনীতিবিদ, লেখক ও কূটনীতিক। তিনি ২০০৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের ৩০তম গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ক্লিনটন প্রশাসনে তিনি জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত এবং জ্বালানি বিষয়ক সচিবের দায়িত্বে ছিলেন।

এছাড়া তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস সদস্য, ২০০৪ সালের ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কনভেনশনের চেয়ারম্যান এবং ডেমোক্র্যাটিক গভর্নরস অ্যাসোসিয়েশনের (ডিজিএ) চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে যোগাযোগ

ভার্জিনিয়া জিউফ্রে ও এপস্টেইনের সহযোগী ঘিসলেন ম্যাক্সওয়েলের মধ্যে চলমান একটি দেওয়ানি মামলার আদালত নথিতে রিচার্ডসনের নাম উল্লেখ করা হয়। এসব নথি ২০১৯ সালের ৯ই আগস্ট—এপস্টেইনের মৃত্যুর ঠিক এক দিন আগে—প্রকাশিত হয়।

মামলার নথিতে জিউফ্রে অভিযোগ করেন, ২০০০-এর দশকের শুরুতে নাবালক থাকাকালীন এপস্টেইন ও ম্যাক্সওয়েল তাকে রিচার্ডসনসহ একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তির কাছে যৌন নিপীড়নের জন্য পাঠিয়েছিলেন।

নথি অনুযায়ী, এপস্টেইন ২০০২ সালে নিউ মেক্সিকোর গভর্নর নির্বাচনে রিচার্ডসনের প্রচারণায় ৫০ হাজার ডলার অনুদান দেন এবং ২০০৬ সালের দ্বিতীয় নির্বাচনী প্রচারণাতেও একই অঙ্কের অর্থ প্রদান করেন।

এছাড়া ২০২৫ সালে মার্কিন কংগ্রেস প্রকাশিত এপস্টেইনের হেলিকপ্টার ফ্লাইট লগে দেখা যায়, ২০১১ সালে রিচার্ডসন ও তার চিফ অব স্টাফ ব্রায়ান কন্ডি এপস্টেইন এবং তার তিনজন ভিক্টিমের সঙ্গে ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জে ভ্রমণ করেছিলেন।

শিশু পাচার চক্রে সম্পৃক্ততার অভিযোগ

২০১৯ সালে প্রকাশিত নথিগুলোতে এপস্টেইনের শিশু পাচার চক্রের সঙ্গে রিচার্ডসনের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত দেওয়া হলেও তিনি এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেন।

তার মুখপাত্র দাবি করেন, রিচার্ডসন কখনোই ভার্জিনিয়া জিউফ্রেকে চিনতেন না এবং এপস্টেইনকে নাবালক মেয়েদের সঙ্গে দেখেননি।

ওই বছরের আগস্টে রিচার্ডসন জানান, এপস্টেইন সংক্রান্ত মামলায় তিনি নিউ ইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্টের মার্কিন অ্যাটর্নিকে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। পরে তার আইনজীবীর মাধ্যমে জানানো হয়, সংশ্লিষ্ট সহকারী মার্কিন অ্যাটর্নির কাছ থেকে তারা নিশ্চিত হয়েছেন—রিচার্ডসনের বিরুদ্ধে সরকার সক্রিয়ভাবে কোনো তদন্ত পরিচালনা করছিল না।

অন্যদিকে, ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে মৃত্যুবরণ করা ভার্জিনিয়া জিউফ্রে তার মৃত্যোত্তর প্রকাশিত স্মৃতিকথা Nobody’s Girl: A Memoir of Surviving Abuse and Fighting for Justice (অক্টোবর ২০২৫)-এ পুনরায় দাবি করেন, তাকে রিচার্ডসনের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য করা হয়েছিল।

একই বছরের ১২ই নভেম্বর প্রকাশিত আরও নথিতে নিশ্চিত করা হয়, এপস্টেইনের ব্যক্তিগত যোগাযোগ তালিকায় থাকা বহু নামের মধ্যে রিচার্ডসনের নামও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

Leave A Reply

Exit mobile version