ঝুঁকিতে হেভিওয়েট নেতারা
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হেভিওয়েট প্রার্থীরা ঝুঁকির মধ্যে আছেন
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হেভিওয়েট প্রার্থীরা ঝুঁকির মধ্যে আছেন। বড় বড় রাজনৈতিক নেতারাও নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার বিষয়ে তীব্র চ্যালেঞ্জে পড়ছেন। নানামুখী পরিকল্পনা করেও জয়ের ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারছেন না তারা। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান, জাতীয় নাগরিক পার্টির আহবায়ক নাহিদ ইসলাম, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস ও সালাহউদ্দিন আহমদের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
যদিও দুইটি আসনে নির্বাচন করার কারণে তারেক রহমান অনেকটাই চাপমুক্ত। ঢাকা-১৭ আসনের পাশাপাশি বগুড়া-৬ আসন থেকেও ধানের শীষের প্রার্থী হয়েছেন তিনি। নিজ জেলা বগুড়ায় তারেক রহমানের বিজয় শতভাগ নিশ্চিত বলে জানা গেছে। অন্য হেভিওয়েট নেতারা মাত্র একটি করে আসনে প্রার্থী হওয়ায় চাপমুক্ত হতে পারছেন না। কোনো কারণে পরাজিত হয়ে গেলে সংসদে যাওয়ার পথই বন্ধ হয়ে যাবে। অবশ্য গণভোটে হ্যাঁ জয়যুক্ত হলে সংসদের উচ্চকক্ষে এমন নেতারা ঠাঁই পাবেন বলে আশা করছেন তাদের সমর্থকরা।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে ফ্যাসিবাদবিরোধি শক্তিগুলোর বিভক্তির প্রেক্ষিতে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে হেভিওয়েট প্রার্থীদের পরাজিত করতে উঠেপড়ে লেগেছে ফ্যাসিবাদী দলটি। দলীয়ভাবে অংশগ্রহণ না থাকলেও নির্বাচনটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে আওয়ামী লীগ ও তার শরিকরা। ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচারের পাশাপাশি সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার পরামর্শও দিচ্ছে দলটি। যারা ভোট দেবেন, তাদেরকে আহবান জানানো হচ্ছে জাতীয় পার্টির প্রার্থীদের পক্ষে থাকার জন্য। তবে কিছু কিছু প্রার্থীর বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের ভোটাররা খুবই সক্রিয়। এক্ষেত্রে তাদের অপছন্দের দলের শীর্ষ নেতারই লক্ষ্যবস্তু। এ কারণে যেখানে জাতীয় পার্টির সম্ভাবনা কম সেসব আসনে হেভিওয়েট নেতাদের পরাজয় নিশ্চিত করতে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি।
ঢাকা-১৭ আসনে ঝুঁকিতে তারেক রহমান ॥ ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে ঢাকা-১৭ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এ আসনে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী বাংলাদেশ ফার্টিলিটি হসপিটালের চেয়ারম্যান বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এস এম খালিদুজ্জামান। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মোহাম্মদ উল্লাহ এবং বাংলাদেশ ন্যাশনাল ফ্রন্টের আবুল কালাম আজাদও এ আসনে প্রার্থী হয়েছেন। এ আসনে মোট ভোটার তিন লাখ ৩৩ হাজার ৭৭৭ জন।
পুরুষ ভোটার এক লাখ ৭৪ হাজার ৭০৯ এবং নারী এক লাখ ৫৯ হাজার ৬০ জন। রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান, বনানী, নিকেতন, বারিধারা ও সেনানিবাসের পাশাপাশি কড়াইল বস্তির বাসিন্দারাও এই নির্বাচনী এলাকার ভোটার। বলা হচ্ছে, কড়াইল বস্তির ভোট যেদিকে যাবে নির্বাচনী পাল্লা তারই ভারি হবে। এ কারণে প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতিগুলো উচ্চারিত হচ্ছে বস্তিবাসীকে ঘিরে।
নির্বাচনে তারেক রহমানের বিজয় নিয়ে বিএনপির নেতারা ব্যাপকভাবে আশাবাদী হলেও তাতে সহজে ছেড়ে দিতে নারাজ জামায়াত। দলীয় প্রার্থীকে বিজয়ী করে আনতে রাত-দিন পরিশ্রম করে চলেছেন জামায়াত এবং তাদের জোট সমর্থকরা। বিশেষ করে বিএনপিপন্থি ডাক্তারদের পক্ষ থেকে ডাক্তার খালিদুজ্জামানকে বিতর্কিত করার একটি অনৈতিক চেষ্টায় চরমভাবে ক্ষুব্ধ হয়েছেন জামায়াত কর্মীরা। যে কোনো মূল্যে তারেক রহমানকে পরাজিত করে প্রতিশোধ নিতে মরিয়া দলটির নেতা-কর্মীরা। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের ভোটারদের সমর্থনও তারা পাচ্ছেন বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। ঢাকা-১৭ আসনে বিজয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী ডাক্তার খালিদুজ্জামান। তবে তারেক রহমানের প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট আবদুস সালাম বলেন, এ নির্বাচনে তারেক রহমান লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হবেন।
চাপমুক্ত নন ডাক্তার শফিক ॥ এবারের নির্বাচনে ঢাকা-১৫ আসন থেকে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডাক্তার শফিকুর রহমান। এ আসনে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির শফিকুল ইসলাম খান। এ আসনে মোট ভোটার তিন লাখ ৫১ হাজার ৭১৮ জন। পুরুষ এক লাখ৭৯ হাজার ৬১৬ এবং নারী ভোটার এক লাখ ৭২ হাজার ৯৮ জন। মিরপুর ও কাফরুল থানাধীন ৪, ১৩, ১৪ ও ১৬ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দারা আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট দেবেন। বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের আমির এবং ১১ দলীয় জোটের প্রধান ডাক্তার শফিকুর রহমানের বিপরীতে বিএনপির থানা পর্যায়ের নেতা শফিকুল ইসলাম খানকে আপাতদৃষ্টিতে দুর্বল প্রার্থী মনে হলেও নির্বাচনে ডাক্তার শফিকের জয়ের পথ মোটেই সহজ নয়।
কারণ ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ এবং তার জোটসঙ্গীরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, শেখ হাসিনার পতনের পেছনে জামায়াত-শিবিরের ভূমিকাই ছিল মুখ্য। ফলে যে কোনো মূল্যে ডাক্তার শফিককে পরাজিত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে সব রাজনৈতিক শক্তি যা প্রকারান্তরে ধানের শীষের প্রার্থীকেই সাহস যোগাচ্ছে। যদিও দলীয় আমিরের বিজয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী জামায়াতের কর্মী-সমর্থকরা।
মির্জা ফখরুলের ভয় দেলাওয়ার ॥ এবারের নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাবেক সভাপতি দেলাওয়ার হোসেন। আছেন হাতপাখার মো. খাদেমুল ইসলাম। এ আসনে জাতীয় পার্টির কোনো প্রার্থী না থাকায় আওয়ামী লীগের ভোটাররা মির্জা ফখরুলকে ভোট দেবেন বলে আশা করছেন বিএনপির নেতা-কর্মীরা। এক্ষেত্রে একধাপ আগ বাড়িয়ে ক্ষমতায় গেলে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে করা সব মামলা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে বিতর্কের মুখেও পড়েন ফখরুল।
তবে স্থানীয় ভোটারদের ধারণা, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিজয় সহজ হচ্ছে না। সবশেষ রাতের অন্ধকারে জামায়াত প্রার্থীর বিলবোর্ড ভেঙে ফেলার ভিডিও ভাইরাল হলে মির্জা ফখরুলের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচার আরও জোরদার হয়। এ আসনে জামায়াত প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন অত্যন্ত জনপ্রিয়। হাসিনাবিরোধী আন্দোলন চলাকালে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি হিসেবে দেলাওয়ার ছিলেন খুবই নির্যাতিত। তার পক্ষে একাধিক জনসভায় নাম ধরে কথা বলেছেন বেগম খালেদা জিয়া। জামায়াতের লোকজন দেলাওয়ারকে ‘জীবন্ত শহীদ’ আখ্যা দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তারা পক্ষে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। জামায়াত-বিএনপি উভয় পক্ষই এ আসনে বিজয়ের ব্যাপারে সমান আশাবাদী। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের ভোটররাই নির্ধারণ করবে জয়-পরাজয়।
মির্জা আব্বাসের সামনে হাদি ফ্যাক্টর ॥ ঢাকা-৮ আসনের হেভিওয়েট প্রার্থী বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ঢাকার সাবেক মেয়র, সাবেক মন্ত্রী মির্জা আব্বাস। এ আসনে তার সামনে দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছেন জুলাই আন্দোলনের অগ্রসেনানি এনসিপি নেতা নাসির উদ্দিন পাটওয়ারি। এ আসনে মির্জা আব্বাস বেশ জনপ্রিয় নেতা হলেও তার সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। কারণ এ আসনে প্রার্থী হতে চেয়ে প্রচারকালে খুন হন জুলাই যোদ্ধা ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদি।
হাদি হত্যাকান্ডের জন্য তার অনুসারীরা আঙ্গুল তাক করে রেখেছেন মির্জা আব্বাসের দিকে। আর নাসির উদ্দিন পাটওয়ারি নিজেকে দাবি করে চলেছেন হাদির অনুসারী হিসেবে। ফলে বিএনপির ভোট ব্যাংক থাকা সত্ত্বেও ধানের শীষের প্রার্থীর বিজয়ে পুরোপুরি আশাবাদী হতে পারছেন না আব্বাসের সমর্থকরা। বিশেষ করে নাসিরের প্রচারকালে ডিম নিক্ষেপসহ বিতর্ক যেন লেগেই আছে। এনসিপি সমর্থকদের আশা, তরুণ ভোটারদের ওপর ভর করে পাটওয়ারি নিশ্চিতভাবেই বিজয়ী হবে। আর বিএনপি নেতা-কর্মীদের আশা, শেষ হাসিটা মির্জা আব্বাসই হাসবেন।
চাপমুক্ত নন সালাহউদ্দিন ॥ জাতীয় সংসদে ২৯৪ নং আসনটি কক্সবাজার-১। এ আসনে বিএনপির প্রার্থী দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ। চকোরিয়া ও পেকুয়া এলাকা নিয়ে গঠিত এ আসনে মোট ভোটার পাঁচ লাখ ৪০ হাজার ৪৯০ জন। এখানে জামায়াত জোটের প্রার্থী আবদুল্লাহ ফারুক দলটির স্থানীয় পর্যায়ের নেতা। এ আসনে সালাহউদ্দিন অত্যন্ত জনপ্রিয় হলেও টেনশনমুক্ত হতে পারছেন না। কারণ তিনি দীর্ঘদিন দেশেই থাকতে পারেননি।
শেখ হাসিনার শাসনামলের প্রায় পুরোটাই তিনি ভারতে অপহৃত অবস্থায় ছিলেন। যদিও বিরোধীরা তার এই অবস্থানকাল নিয়ে নানামুখি অপপ্রচার চালিয়ে তাকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছেন। তাছাড়া সালাহউদ্দিনের দীর্ঘ অনুপস্থিতির সময়ে মাঠে ব্যাপক কাজ করেছেন জামায়াতের প্রার্থী। বিশ্লেষকদের মতে, এমতাবস্থায় আওয়ামী লীগের ভোট যদি জামায়াত টানতে পারে তবেই কেবল চাপে পড়বেন সালাহউদ্দিন।

