বিশেষ প্রতিনিধি | গাজীপুর
রাজনৈতিক অস্থিরতা ও টানা গণআন্দোলন-পরবর্তী অর্থনৈতিক ধাক্কায় গাজীপুরের তৈরি পোশাক খাতে গভীর সংকট দেখা দিয়েছে। ক্রয়াদেশ বাতিল ও কারখানা বন্ধের কারণে শত শত শ্রমিকের জীবন এখন চরম অনিশ্চয়তায়। উন্নয়ন ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের আলোচনার অন্তরালে চাপা পড়ে গেছে রুজিনা বেগমের মতো প্রান্তিক পোশাক শ্রমিকদের নিত্যদিনের হাহাকার।
বহু বছর ধরে ভোর চারটায় ঘুম ভাঙা রুজিনা বেগম প্রতিদিনের মতো সকালেই ছোটেন গলি পেরিয়ে কাজে। তবে গাজীপুরের গলির মোড়ে ‘তারাটেক্স ফ্যাশন’-এর সেই পরিচিত প্রাণবন্ত ফটকটি এখন থমকে গেছে। ঝুলছে একটি বিশালাকার মরচে ধরা তালা।
জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের পর একের পর এক আন্তর্জাতিক ক্রয়াদেশ (অর্ডার) বাতিল হওয়া এবং ধারাবাহিক লোকসানের অজুহাতে মালিকপক্ষ একদিন সকালেই কারখানাটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে। নোটিশ ঝুলিয়ে দেওয়ার পর থেকে বন্ধ হয়ে যায় হাজারো শ্রমিকের আয়ের পথ। দুই মাসের বকেয়া বেতন ও ওভারটাইমের দাবিতে কারখানার গেটে দিনের পর দিন আন্দোলন ও স্লোগান দিয়েও সমাধান মেলেনি; শ্রমিকদের পাওয়ার শেষ আশাটুকুও ধূলিসাৎ হয়ে গেছে।
বর্তমানে গাজীপুরের এক চিলতে টিনের ঘরে চরম অভাব ও অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে অপারেটর রুজিনা বেগমের। চার মাসের ঘর ভাড়া বাকি পড়ে থাকায় বাড়িওয়ালার কটু কথা ও বাসা ছেড়ে দেওয়ার হুমকি এখন নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা।
রুজিনার স্বামী একজন দিনমজুর, তবে বাজারে কাজের তীব্র সংকট। একদিন কাজ মিললে তিনদিন তাকে বসে থাকতে হয়। অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্যের কারণে পরিবারটির দুপুরের আহার জুটলে রাতের খাবার অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। আট বছরের শিশু সন্তানের চাহিদা পূরণ করা তো দূরের কথা, একটি বাড়তি সুঁচ বা সুতা কেনার সামর্থ্যও এখন আর নেই রুজিনার।
“পাড়ার মুদি দোকানদার বাকিতে সওদা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। সহকর্মীদের অনেকেই দেনা শোধ করতে না পেরে রাতের আঁধারে গ্রামে পালিয়েছেন, আবার কেউ কেউ একবেলা খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন।” — ক্ষোভ ও হতাশায় জানান এক স্থানীয় ভুক্তভোগী।
বিকেলের বিষণ্ণ আলোয় টিনের ঘরের দরজায় বসে থাকা রুজিনার কানে এখনো যেন বেজে ওঠে তারাটেক্সের চেনা ফ্লোরের হইচই আর মেশিনের খটখট শব্দ। বড় বড় অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক পরিবর্তনের গল্পের আড়ালে রুজিনাদের মতো হাজারো সাধারণ শ্রমিকের আড়ালে থাকা করুণ গল্পগুলো আজ কেবল চিলতে টিনের ঘরের চার দেয়ালেই বন্দি হয়ে রইল।
শিল্পাঞ্চলে দ্রুত কারখানা সচল করা এবং বকেয়া বেতন আদায়ে সরকারি হস্তক্ষেপ ও কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন মানবিক সংকটে পড়া এই পোশাক শ্রমিকেরা।

