নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে গতকাল বুধবার সকালে যখন পাঁচ মাস বয়সী মো.তাকরিমের নিথর দেহটি পড়ে ছিল, তখন হাসপাতালের করিডোর ভারী হয়ে উঠছিল তার মা-বাবা আমেনা বেগম ও মো. মহসীনের বুকফাটা বিলাপে। ভোলা জেলার বাংলাবাজার থেকে আসা এই দম্পতি তাদের কোলের শিশুকে নিয়ে বাড়ি ফেরার স্বপ্ন দেখলেও, শেষ পর্যন্ত ফিরতে হচ্ছে সন্তানের লাশ নিয়ে। হাম ও পরবর্তী নানা জটিলতায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় শিশুটি।
সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত দিশেহারা বাবা মহসীন যখন বাড়িতে বৃদ্ধা মাকে ফোন করে বললেন, “মা, তোমার নাতিরে আল্লায় নিয়া গেছে গো… তোমার রুমে যাইয়া আর কান্না করব না তোমার নাতি,” তখন সেখানে উপস্থিত সবার চোখে পানি টলমল করছিল।
অন্যদিকে মা আমেনা বেগমের অসংলগ্ন বিলাপ—”বাবারে কিন্তু আমি বুকে নিয়া বাসায় যামু… কেন দয়া করল না আল্লাহ”—হাম পরিস্থিতির ভয়াবহতা এবং বাবা-মায়ের চরম অসহায়ত্বের এক করুণ চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে।
তাকরিমের এই অকাল মৃত্যু কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি বর্তমানে সারাদেশে শিশুদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া হামের প্রকোপের এক ভয়াবহ সংকেত। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে হামের প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকা থেকে আসা শিশুদের মধ্যে জটিলতা বেশি দেখা দিচ্ছে।
প্রান্তিক পর্যায়ে অনেক শিশু নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির বাইরে থেকে যাচ্ছে, যার ফলে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে।
পাঁচ মাসের তাকরিমের মতো ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে হাম কেবল জ্বর বা র্যাশ নয়, বরং নিউমোনিয়া বা মাল্টি-অর্গান ফেইলিউরের মতো প্রাণঘাতী জটিলতা তৈরি করছে।
অনেক ক্ষেত্রে প্রাথমিক লক্ষণ অবহেলা করে জটিল অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসায় মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে।
তাকরিমের মায়ের সেই বুকফাঁটা প্রশ্ন—”আমি তো বাবারে এমনে আনি নাই, এখন এমনে কেমনে নিয়া যামু”—দেশের হাজারো দরিদ্র ও অসহায় বাবা-মায়ের মনের অব্যক্ত যন্ত্রণা। ভোলার মতো উপকূলীয় জেলা থেকে উন্নত চিকিৎসার আশায় রাজধানীতে এলেও শেষ রক্ষা না হওয়া আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং সচেতনতার অভাবকেই নির্দেশ করে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে হামের টিকা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হলেও, মাঠ পর্যায়ের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। তাকরিমের মতো আর কোনো শিশুর প্রাণ যেন হামের মতো নিরাময়যোগ্য রোগে না যায়, সেজন্য এখনই দেশজুড়ে জরুরি স্বাস্থ্য সতর্কতা ও টিকাদান জোরদার করা প্রয়োজন।
পরিশেষে, ছোট্ট তাকরিমের শূন্য কোল নিয়ে ফিরে যাওয়া এই বাবা-মায়ের শোক যেন সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক সতর্কবার্তা হয়ে থাকে।

