স্থানীয় সংবাদদাতা: চট্টগ্রামের বাঁশখালী’তে এক রহস্যময় ও উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘ ১২ দিন ধরে একই মাদ্রাসার দুই শিশু নিখোঁজ থাকলেও আজ অবধি তাদের কোনো হদিস মেলেনি। তারা কি পরিকল্পিত অপহরণের শিকার, নাকি আন্তর্জাতিক মানব পাচার চক্রের জালে বন্দি—এই প্রশ্ন এখন তাদের এলাকার প্রতিটি ঘরে ঘরে।
নিখোঁজ দুই শিশু সম্পর্কে একি মাদ্রাসার (আবু বক্কর সিদ্দিক (রহঃ) ইসলামিয়া মাদ্রাসা, ৪নং ইউনিয়ন) ছাত্র। তারা হলেন, আবদুল্লাহ আলামিন চৌধুরী মানিক (১২), খানখানাবাদ ইউনিয়নের পূর্ব রায়ছটা গ্রামের জাফর আহমদ চৌধুরী সওদাগরের ছেলে ও মোহাম্মদ আবরারুল হক (১২), বৈলছড়ী ইউনিয়নের পশ্চিম চেচুরিয়া ঘোনা পাড়ার আলমগীরের ছেলে।
গত ১৯ এপ্রিল, রবিবার থেকে এই দুই শিশু নিখোঁজ রয়েছে। দিন যত গড়াচ্ছে, পরিবারের সদস্যদের চোখের পানি ততই দীর্ঘ হচ্ছে।
নিখোঁজ মানিকের মা রুমা আক্তার কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, “ছেলের জন্য দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে। সে কোথায় আছে, কেমন আছে—শুধু এই খবরটুকু পেলেও মনটা একটু শান্ত করতে পারতাম। নিখোঁজের পর থেকে আমার সন্তানটার জন্য নামাজ পড়ে পড়ে আল্লাহর কাছে দোয়া চাচ্ছি, আমার সন্তান’টার যাতে খুজ মিলে। প্লিজ, দয়া করে কেউ আমার খুব আদরের ছেলেটার সন্ধান’টা একটু খুঁজে দেন।
অন্যদিকে, আবরারুল হকের পিতা আলমগীর জানান, নিখোঁজ আবরারুল ছিল তাদের সন্তানের মধ্যে খুব আদরের। সন্তানকে ফিরে পেতে তিনি এখন দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। কেউ আবরারুল এর খুঁজ ফেলে তার এই ‘০১৮৪১৯৭০৩৯৬’ নাম্বারে যোগাযোগ করার অনুরোধ জানিয়েছেন।
মানিকের বড় ভাই চৌধুরী মুহাম্মদ রাকিব আক্ষেপ করে ফেইসবুকে পোস্ট-এ লিখেন, আজ বারো দিন ধরে ভাই’টা হারায়ছে। আজ পর্যন্ত এখনো জানতে পারলাম না, যে আমার ছোট ভাই টা কোথায় আছে কেমন আছে। কোনো দয়াবান ব্যাক্তির সামনে কি একটু ও পড়তেছে না, আমার ভাই টা। ও আল্লাহ আমরা কি এমন দোষ করলাম, আপনি যে আমাদের এতো বড় শাস্তি দিচ্ছেন। আমার ছোট ভাই টা রাতে এক রুম থেকে অন্য রুমে যাইতে পর্যন্ত অনেক ভয় পায়। কিন্তু আজ এগারো দিন হয়ে গেছে, রাতটা কোথায় কাটাচ্ছে; কেমনে কাটাচ্ছে? ও আল্লাহ আমি কি করবো, আপনি বলেন। আপনি আমাদেরকে পদ দেখান! কোথায় গেলে আমি আমার ছোট ভাই টা কে খুঁজে পাব, ও আল্লাহ! আমার অনুরোধ থাকবে, যদি কোনো হৃদয়বান কেউ আমার ভাই’কে কোথাও দেখতে পান বা তাদের কোনো সন্ধান পেয়ে থাকেন; দয়া করে আমার নাম্বারে ০১৮১৪৩৫৯৯১৭ যোগাযোগ করিয়েন।
আবু বক্কর সিদ্দিক (রহঃ) মাদ্রাসা হুজুর বলেন, “মাদ্রাসায় কখন আসবে তা জানার জন্য মানিকের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করলে, তারা আমাকে জানান; সকাল ৬টা ৪৩মিনিটে বাড়ি থেকে মাদ্রাসার উদ্দেশ্যে বের হয়েছে বলে জানিয়েছেন। এরপর দুপুর হওয়ার পরেও তারা মাদ্রাসায় না আসার খবর তাদের পরিবার’কে জানালে, তখন তাদের পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করছেন। একই মাদ্রাসার আমার দুইজন ছাত্র এভাবে নিখোঁজ হওয়াটা আমার জন্য খুবই কষ্টকর।”
ছেলের নিখোঁজে আবরারুল হকের মা আর্তনাদ করে বলেন, “আমার ছেলেটা আজ বারো দিন কোথায় আছে, কেমন আছে আমি জানি না! আমরা আমাদের সন্তানদের দ্রুত ফেরত চাই।”
ঘটনার ১২ দিন পার হয়ে গেলেও এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পায়নি তাদের পরিবার। একই মাদ্রাসার দুইজন ছাত্র নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় পরিবারে চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে। এ ঘটনায় বাঁশখালী থানায় সাধারণ ডায়েরি (জি ডি) করছেন বলে জানিয়েছেন অভিভাবকরা।
বাঁশখালী থানার ওসি খালেদ সাইফুল্লাহ জানিয়েছেন, হারিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে নিখোঁজ পরিবার থানায় জি ডি করেছেন। বাঁশখালী থানার একটি টিম তাদেরকে খুঁজতেছে। তারা খুঁজ ফেলে, সাথে সাথে তাদের পরিবার’কে জানাবে বলে জানিয়েছেন।
এলাকাবাসীর প্রশ্ন, কয়েকমাস ধরে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে অনেকের নিখোঁজ ও অপহরণের খবরে তাদের পরিবারের সদস্যের মনে প্রবল আতঙ্ক বিরাজ করছে—ছেলেরা কি ভুল করে কোনো পাচারকারীর খপ্পরে পড়ল? নাকি অন্য কোনো অন্ধকার চক্র তাদের জিম্মি করে রেখেছে? প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপই পারে এই দুই শিশুর পরিবারের কান্না থামাতে।

