নিজস্ব প্রতিবেদক | Info Bangla
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের অন্যতম যুদ্ধাহত নারী মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনা গাইবান্ধার রাজকুমারী রবিদাস ফুলমতি আর নেই। দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় শয্যাশায়ী থাকার পর বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) সন্ধ্যার পর নিজ বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। শুক্রবার (২ অক্টোবর) বিকেল ৩টায় সাদুল্লাপুর উপজেলা সদরের উত্তরপাড়া গ্রামে নিজ বাড়িতে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা ফুলমতিকে সাদুল্লাপুরের উত্তরপাড়ার নিজ বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে নির্মম নির্যাতন চালায়। তখন তার বয়স ছিল আনুমানিক ২৮ বছর। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দীর্ঘ ৪৫ বছর অবহেলা ও বঞ্চনার মধ্যে কাটাতে হলেও অসীম সাহস ও আত্মমর্যাদা নিয়ে জীবনযাপন করেছেন তিনি। অবশেষে ২০১৬ সালের মার্চে তিনি রাষ্ট্রীয়ভাবে বীরাঙ্গনা ও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পান।
ফুলমতির স্বামী কুশিরাম সরকার ফসিয়া ১৯৮৮ সালে মারা যান। স্বামীর মৃত্যুর পর পাঁচ ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে একাই সংসারের কঠিন হাল ধরেন ফুলমতি। পরবর্তীতে তার এক ছেলে ও এক মেয়ের মৃত্যু হয়। স্বীকৃতি পাওয়ার পর তিনি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে নির্মিত ‘বীর নিবাস’-এ বসবাস করছিলেন। এর আগে সাদুল্লাপুর উপজেলা শহরের ভূমি অফিসের সামনে সরকারি খাস জমিতে পরিবার নিয়ে বাস করতেন তিনি।
চিকিৎসার বিষয়ে তার ছেলে মনিরাজ কুমার জানান, দীর্ঘদিন ধরে তার মা প্যারালাইসিস ও ব্রেন স্ট্রোকসহ বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন। এতে তার চলাফেরার সক্ষমতা কমে যায় এবং শেষ দিকে তিনি প্রায় পুরোপুরি শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ ও স্যালাইন দিয়ে নিজ বাড়িতেই চিকিৎসা চলছিল। কিন্তু বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর তার শারীরিক অবস্থার ক্রমাগত অবনতি ঘটে এবং তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
ফুলমতির মৃত্যুতে সাদুল্লাপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রশিদ আজমী বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে ফুলমতির আত্মত্যাগ ও নির্যাতনের ইতিহাস অত্যন্ত বেদনাদায়ক। অনেক চেষ্টা ও আবেদনের পর ২০১৬ সালে তাঁর স্বীকৃতি মেলে। চিকিৎসায় সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন থাকলেও তিনি কিংবা তার পরিবার কখনো কারও কাছে সাহায্যের জন্য হাত পাতেননি। শেষ দিন পর্যন্ত আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে ছিলেন এই বীর নারী।
তার প্রয়াণে সাদুল্লাপুর উপজেলা ও জেলার মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, সাংবাদিক, শিক্ষক ও জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। স্থানীয়রা ফুলমতিকে মহান মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত ইতিহাস উল্লেখ করে নতুন প্রজন্মের কাছে তার ত্যাগ তুলে ধরতে সমাধিস্থলে একটি স্মৃতিফলক বা স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।
