বিশেষ প্রতিবেদক | ঢাকা
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের আপাত স্বস্তি থাকলেও অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের দায় পরিশোধ, বাজেট ঘাটতি এবং রাজস্ব আদায়ে প্রত্যাশিত গতি না থাকায় দেশের অর্থনীতি বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব পদ্ধতি (BPM6) অনুযায়ী বর্তমানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩১ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলারের ঘরে দাঁড়িয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে এই রিজার্ভ জরুরি আমদানি ও দেনা পরিশোধের জন্য কিছুটা স্বস্তিদায়ক মনে হলেও, এর ভেতরে স্বল্পমেয়াদি ও বাজেট সহায়তা বাবদ নেওয়া সুনির্দিষ্ট ঋণ যুক্ত থাকায় প্রকৃত নিট সম্পদের পরিধি নিয়ে তৈরি হয়েছে অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞদের মতে, ঋণের অর্থ দিয়ে তৈরি রিজার্ভ এবং নিজস্ব আয় অর্জনের মাধ্যমে সঞ্চিত রিজার্ভের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। বাজেট সহায়তার নামে সংগৃহীত ঋণ কেবল সাময়িক স্থায়িত্ব প্রদান করে, কিন্তু সুদের ঋণভার বৃদ্ধি করে রাজস্ব খাতের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিগত ২০২৪-২৫ এবং ২০২৫-২৬ দুই অর্থবছরে ইআরডি-র আওতায় গৃহীত প্রকল্পের মূল ঋণের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৮.৫৬ বিলিয়ন এবং ৮.০৭ বিলিয়ন ডলার—যা সর্বমোট দাঁড়ায় প্রায় ১৬.৬৩ বিলিয়ন ডলারে।
তবে কেবল বৈদেশিক সহায়তার অর্থ ছাড় বা ঋণ চুক্তি সম্পাদনই শেষ কথা নয়; বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে উন্নয়ন প্রকল্পের ধীরগতি ও কার্যকর বাস্তবায়নের অভাব। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার কারণে ঋণের বিপরীতে অর্থ ব্যয় হলেও প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক লাভ মিলছে না। ফলে আসল ঋণের পাশাপাশি অতিরিক্ত সুদের বোঝা রাজস্ব বাজেটের ওপর এসে পড়ছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাঙ্ক্ষিত সংস্কার ও রাজস্ব আদায়ের কৌশলগত দুর্বলতার কারণে অর্থবছরের পর বছর অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেকটাই পিছিয়ে থাকছে। এনবিআর কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব সংগ্রহ করতে না পারায় অর্থসংস্থানের বড় অংশই সম্পন্ন করতে হচ্ছে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থা ও সঞ্চয়পত্রের ঋণ থেকে।
রাজস্ব বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ না থাকায় দেশীয় ঋণের অর্থ ব্যবহৃত হচ্ছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রদান ও পরিচালন ব্যয় নির্বাহের মতো অ-উন্নয়ন খাতে। ফলে সার্বিক অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন তৈরির সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।
জ্বালানি নিরাপত্তায় আন্তর্জাতিক বাজার বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য উৎস থেকে উচ্চমূল্যে গ্যাস ও তেল আমদানির বাধ্যবাধকতা থাকায় সরকারের ওপর বিশাল ভর্তুকির চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বকেয়া দেনা মেটাতে একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রা বের হয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে দেশীয় মুদ্রায় ভর্তুকি বাবদ বিপুল পরিমাণ বাজেট বরাদ্দ রাখতে হচ্ছে। এর ফলে বাজেটের অন্যান্য উন্নয়নমূলক খাতে বরাদ্দ ছাঁটাইয়ের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনীতি বর্তমানে অনেকটাই ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে প্রবাসী আয়ের (রেমিট্যান্স) ওপর। রপ্তানি আয়ে ধীরগতি এবং সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না আসার কারণে রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীলতা বহুগুণ বেড়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, যেকোনো বাহ্যিক ধাক্কায় বা কোনো এক মাসে প্রবাসীদের প্রেরিত রেমিট্যান্স প্রবাহে ঘাটতি দেখা দিলে বৈদেশিক মুদ্রার সাময়িক সেবামূলক ব্যয় মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নিজস্ব গচ্ছিত রিজার্ভ ভাঙতে হবে।
এমন পরিস্থিতিতে বর্তমান বিএনপি বৈদেশিক ঋণ ও বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে না পারলে এই বহুমুখী অর্থনৈতিক সংকটের সার্বিক দায়ভার বহন করা তাদের জন্য কঠিন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। স্বল্প সময়ে রাজস্ব বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার টেকসই প্রবাহ নিশ্চিত করতে না পারলে দেশে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা রূপ নিতে পারে বলে সতর্ক করছেন নীতি-বিশ্লেষকরা।
