নিজস্ব প্রতিবেদক | Info Bangla
বাংলাদেশ আজ তার স্বাধীনতার ৫৪ বছরের ইতিহাসে দাঁড়িয়ে। এই সুদীর্ঘ সময়ে এদেশের রাজনীতি ও কূটনীতিতে অনেক চড়াই-উতরাই এসেছে, কিন্তু অতি সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার শেরেবাংলা নগরে যা ঘটল, তা দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের রীতিমতো হতবাক করে দিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশের পবিত্র মহান সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজন করা হলো জমকালো এক উৎসবের।
ঐতিহাসিকভাবে, বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন দূতাবাস প্রতি বছর ৪ঠা জুলাই তাদের নিজস্ব প্রাঙ্গণে বা অভ্যন্তরীণ পরিমণ্ডলে সীমিত পরিসরে স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করে থাকে। এটাই আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সাধারণ নিয়ম। কিন্তু এবার বিএনপির নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার সমস্ত প্রথা ভেঙে খোদ জাতীয় সংসদের আঙিনায় বিদেশী একটি রাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস রাষ্ট্রীয় আমেজে উদযাপনের সুযোগ করে দেওয়ায় দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
ইতিহাসের নির্মম পরিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের অবমাননা
জাতীয় সংসদের মতো একটি সর্বোচ্চ সার্বভৌম প্রতিষ্ঠান, যা এদেশের মানুষের স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রতীক, সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস পালনকে অনেকেই ইতিহাসের এক নির্মম পরিহাস হিসেবে দেখছেন।
১৯৭১ সালে যখন বাঙালি জাতি পাকিস্তানের বর্বর সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে জীবনপণ লড়াই করছিল, তখন তৎকালীন মার্কিন সরকার (বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার) সরাসরি পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল। বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহর পাঠানো থেকে শুরু করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করা সবই ছিল ওয়াশিংটনের তৎকালীন নীতি। এদেশের লাখো শহীদের রক্তে ভেজা স্বাধীন ভূখণ্ডে, সেই বিরোধিতাকারী শক্তির প্রতীকী তুষ্টির জন্য সংসদের আঙিনায় এমন আয়োজনকে নেটিজেন এবং বুদ্ধিজীবীদের একটি বড় অংশ ‘সার্বভৌমত্ব ও মুক্তিযুদ্ধের অবমাননা’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন।
ক্ষমতার সমীকরণ নাকি ‘গোলামির’ রাজনীতি?
এই নজিরবিহীন আয়োজনের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে—সরকার ঠিক কাকে খুশি করার জন্য এবং কী অর্জনের উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রীয় এই স্পর্শকাতর স্থানটিকে ব্যবহার করতে দিল?
সাধারণ মানুষের পাশাপাশি রাজনৈতিক মহলের কেউ কেউ সরাসরি প্রশ্ন তুলছেন বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব ও তারেক রহমানের দিকে। সমালোচকদের মতে, নিজেদের ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করতে কিংবা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আশীর্বাদ লাভ করতেই কি এই ‘নতজানু’ কূটনীতির আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে? ভিন্ন একটি রাষ্ট্রের মন জুগিয়ে চলার এই নীতিকে অনেকেই ‘রাজনৈতিক গোলামি’র শামিল বলে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।
অঙ্গরাজ্য নাকি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র?
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নেটিজেনদের প্রতিক্রিয়া ছিল আরও তীব্র ও ক্ষুরধার। অনেক সাধারণ নাগরিক মন্তব্য করেছেন, আমাদের মহান সংসদের প্রাঙ্গণে যেভাবে বিদেশী পতাকার আলোড়ন এবং উৎসবের আবহ তৈরি করা হয়েছে, তাতে মনে হচ্ছে আমরা কোনো স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের নাগরিক নই, বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো দূরবর্তী অঙ্গরাজ্যের অংশ!
একটি স্বাধীন দেশের আত্মমর্যাদা এবং জাতীয় চেতনা তার নিজস্ব প্রতীকগুলোর ওপর নির্ভর করে। সংসদ ভবন শুধু একটি দালান নয়, এটি কোটি মানুষের আবেগের জায়গা।
সেখানে অন্য দেশের জাতীয় দিবস পালন সাধারণ মানুষের মনে তীব্র মনস্তাত্ত্বিক আঘাত হেনেছে।
জাতীয় আত্মমর্যাদার প্রশ্ন এখন পর্যন্ত বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে পরিষ্কার করা হয়নি, ঠিক কী কৌশলগত কারণে বা কী অর্জনের উদ্দেশ্যে এই নজিরবিহীন পদক্ষেপ নেওয়া হলো।
তবে রাজনৈতিক সমালোচকদের একটি বক্তব্য এখানে অত্যন্ত প্রণিধানযোগ্য নিজ ভূখণ্ডের স্বাধীনতা ও ত্যাগের ইতিহাসে বিশ্বাসী কোনো সরকার বা সচেতন নাগরিক গোষ্ঠী, কখনোই ভিন্ন একটি দেশের স্বাধীনতা দিবসকে নিজেদের রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় প্রতীকের স্থানে এভাবে ঘটা করে উদযাপন করতে দিতে পারে না।
কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার অনেক পথ থাকে, কিন্তু তা যদি দেশের সার্বভৌমত্বের মর্যাদা এবং ইতিহাসের গৌরবকে ম্লান করে দেয়, তবে সেই কূটনীতি আখেরে দেশের জন্য কোনো সুফল বয়ে আনে না। মহান সংসদের দক্ষিণ প্লাজার এই ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবেই থেকে যাবে।
