নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
খাদ্য মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু সেই খাদ্যই যদি অজান্তে মানুষের শরীরে বিষ হয়ে ঢুকে যায়, তাহলে বিষয়টি আর শুধু বাজার, দাম বা আমদানির হিসাব থাকে না; এটি হয়ে ওঠে একটি নীরব জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়। বাংলাদেশে চাল শুধু একটি খাদ্যপণ্য নয়, এটি কোটি মানুষের প্রতিদিনের জীবন। সকাল, দুপুর, রাত—একটি পরিবারের টেবিলে চাল মানে ভরসা, বেঁচে থাকা এবং নিরাপত্তা। তাই চালের মান নিয়ে যেকোনো অবহেলা মানে সরাসরি মানুষের শরীর ও ভবিষ্যৎ নিয়ে খেলা।
সম্প্রতি বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পাকিস্তান থেকে ৫০ হাজার মেট্রিক টন সাদা চাল আমদানির সিদ্ধান্ত একটি বড় প্রশ্ন ও উদ্বেগের তৈরি করেছে। প্রতি টন প্রায় ৩৯৫ ডলার দামে এই চাল আমদানিতে বাংলাদেশের খরচ হবে প্রায় ২৪১ কোটি টাকারও বেশি। বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য চাল আমদানি নতুন কিছু নয়। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, যে পাকিস্তানি চাল অতিরিক্ত কীটনাশক ও ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতির কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে বারবার প্রত্যাখ্যাত হচ্ছে, সেই চাল বাংলাদেশের মানুষের জন্য কেন আনা হচ্ছে? ইউরোপ যে চাল মানুষের শরীরের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে ফিরিয়ে দিচ্ছে, সেই চাল যদি বাংলাদেশে ঢুকে পড়ে, তবে তা মানুষের খাবারের প্লেটে সরাসরি ঝুঁকি তুলে দেওয়ার মতো ঘটনা।অভিযোগ উঠেছে, এই চালে ক্লথিয়ানিডিন, ক্লোরপাইরিফস, ইমিডাক্লোপ্রিড, থায়ামেথক্সাম, কার্বেন্ডাজিম ও আফলাটক্সিনের মতো বিপজ্জনক রাসায়নিক রয়েছে। এগুলো কোনো সাধারণ ত্রুটি নয়। এই উপাদানগুলো দীর্ঘমেয়াদে মানবদেহের লিভার, কিডনি, স্নায়ুতন্ত্র, হরমোন ও রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থায় মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ‘আফলাটক্সিন’ নামক ছত্রাকজাত বিষটি লিভারের ক্ষতি এবং ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
মূলত পাকিস্তানের খাদ্যপণ্যে অতিরিক্ত কীটনাশকের অভিযোগ নতুন নয়। জলবায়ু পরিবর্তন, পোকামাকড়ের আক্রমণ, দুর্বল কৃষি-নিয়ন্ত্রণ এবং দ্রুত ফলন বাড়ানোর প্রবণতার কারণে সেখানে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। সমস্যা হলো, মাঠের সেই বিষ শেষ পর্যন্ত মানুষের থালায় এসে পৌঁছায়।
বাংলাদেশের জন্য এই ঝুঁকিটা আরও ভয়াবহ। কারণ এখানে চাল কোনো বিলাসপণ্য নয়, এটি প্রতিদিনের প্রধান খাবার। ইউরোপে যে চাল সীমান্তেই আটকে দেওয়া হয়, বাংলাদেশে সেই চাল কোটি মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে যেতে পারে। তখন ক্ষতিটা শুধু একজন মানুষের নয়, পুরো জাতির শরীরের ওপর ধীরে ধীরে জমতে থাকা বিষের মতো কাজ করবে। রাষ্ট্র যখন মানুষের ভাতের নিরাপত্তা দিতে পারে না, তখন সেই ভাত আর শুধু খাদ্য থাকে না; তা হয়ে ওঠে নীরব মৃত্যুর দীর্ঘ ছায়া।
জনসাধারণের জন্য কম দামে চাল পাওয়া অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সস্তা চালের নামে যদি মানুষের শরীরে কীটনাশক, ছত্রাকজাত বিষ এবং ক্যানসার-ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান ঢুকে পড়ে, তাহলে সেটি আর অর্থনৈতিক সাশ্রয় থাকে না। সেটি মূলত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য বিক্রি করে সাময়িক বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা মাত্র।
এই পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছেন, পাকিস্তান থেকে চাল আমদানির প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করার আগে আন্তর্জাতিক মানের ল্যাবে প্রতিটি চালান কঠোরভাবে পরীক্ষা করা জরুরি। শুধু চাল ভাঙা কি না, পোকা আছে কি না কিংবা আর্দ্রতা কত—ঐতিহ্যগত এসব পরীক্ষা করলেই হবে না। কীটনাশকের মাত্রা, ভারী ধাতু, আফলাটক্সিন এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির প্রতিটি উপাদান নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করতে হবে। কারণ প্রশ্নটি শুধু চালের নয়; প্রশ্ন হলো বাংলাদেশের মানুষের খাবারের প্লেটে আসলে কী ঢুকছে? সস্তা চালের নামে কোনো বিষাক্ত ভবিষ্যৎ যেন মানুষের ঘরে না ওঠে, সেটাই এখন সময়ের বড় দাবি।
