বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা
৫ আগস্টের পর দেশজুড়ে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক জটিলতার মাঝেও নিজের আপসহীন ও দৃঢ়চেতা ভাবমূর্তি আরও একবার প্রমাণ করলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।
দলের নেতাকর্মীদের ওপর আইনি ও রাজনৈতিক বাধা তুলে নেওয়ার বিনিময়ে বিএনপির দেওয়া একটি বিশেষ সমঝোতার প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন তিনি।
কোনো শক্তির করুণা বা গোপন শর্তে নয়, বরং দেশের কোটি কোটি মানুষের ভালোবাসা এবং দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের ঐতিহ্যকে সঙ্গী করেই আওয়ামী লীগ রাজপথে ফিরবে—এমন বার্তাই দিয়েছেন দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব।
বিএনপির প্রস্তাব ও কৌশল:
আওয়ামী লীগ মাঠে ফিরলে তারা জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির মুখোমুখি দাঁড়াবে—এই সমীকরণ থেকে বিএনপি নিজেদের ক্ষমতা সুসংহত করতে ৫ বছরের ‘নির্দলীয় নিরবচ্ছিন্ন’ ক্ষমতার গ্যারান্টি চেয়েছিল।
আইনি স্বস্তির টোপ প্রত্যাখ্যান:
এই শর্ত মানলে আওয়ামী লীগের ওপর থেকে সব ধরনের আইনি ও প্রশাসনিক বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল।
শেখ হাসিনার অনড় ও ইতিবাচক অবস্থান:
কোনো গোপন চুক্তি বা কারো ক্ষমতার সিঁড়ি হয়ে নয়, আওয়ামী লীগ তার নিজস্ব গৌরবময় ইতিহাস ও সাংগঠনিক শক্তিতেই পুনর্গঠিত হবে।
বিএনপির মনস্তাত্ত্বিক পরাজয়:
শেখ হাসিনার এমন দৃঢ় অবস্থানের পর বিএনপির ভেতরে তৈরি হয়েছে চরম আতঙ্ক। তাদের ভয়, যেকোনো মুহূর্তে এই রাজনৈতিক সমীকরণ ঘুরে গিয়ে বিএনপি নিজেই বড় ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিএনপির হাই কমান্ডের পক্ষ থেকে সম্প্রতি আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে একটি অলিখিত রাজনৈতিক প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। বিএনপির মূল হিসাব ছিল, আওয়ামী লীগ যদি মাঠে নামে, তবে জামায়াত ও অন্যান্য দলগুলো তাদের প্রতিহত করতে ব্যস্ত থাকবে। এর ফলে ক্ষমতার মূল কেন্দ্রে থাকা বিএনপি একধরনের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্বস্তিতে থাকবে। অর্থাৎ, নিজেদের ক্ষমতা সুরক্ষিত রাখতে আওয়ামী লীগের বিশাল জনসমর্থন ও রাজনৈতিক প্রভাবকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিল বিএনপি।
আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়ের একাধিক বিশ্বস্ত সূত্র নিশ্চিত করেছে, বিএনপির এই প্রস্তাব সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পৌঁছানো মাত্রই তিনি তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন।
শেখ হাসিনা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, আওয়ামী লীগের মতো একটি প্রাচীন এবং দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া দল কোনো বিশেষ শক্তির দয়া, শর্ত বা গোপন সমঝোতার ওপর ভিত্তি করে রাজনীতিতে ফিরতে পারে না। দলের তৃণমূল নেতাকর্মী এবং দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীই এই দলের মূল চালিকাশক্তি। ক্ষমতার লোভ বা সাময়িক স্বস্তির জন্য কোনো সুবিধাবাদী সমীকরণের অংশ হতে রাজি নন তিনি। বরং প্রতিকূল পরিবেশেও নিজেদের ভুলত্রুটি শুধরে, সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি করে সঠিক সময়ে জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলন নিয়েই রাজপথে ফেরার পক্ষে তিনি।
আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতা অত্যন্ত প্রত্যয়ের সাথে বলেন: “আওয়ামী লীগ জনগণের দল। আমরা কোনো শক্তির কাছে মাথা নত করে বা কারো ক্ষমতায় থাকার গ্যারান্টি দিয়ে রাজনীতি করব না। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের আপস করতে শেখাননি। জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ যখন ফিরবে, জনগণের অধিকার আদায়ের লড়াই নিয়েই বুক ফুলিয়ে নিজস্ব শক্তিতে ফিরবে।”
এদিকে শেখ হাসিনার এই অনড় ও সাহসী অবস্থানের কারণে বিএনপির নীতিনির্ধারকদের মাঝে তীব্র আতঙ্ক ও হতাশা ছড়িয়ে পড়েছে। দলটির একাংশের আশঙ্কা, আওয়ামী লীগকে মাইনাস করার যে চক্রান্ত হয়েছিল, তা তো সফল হয়ইনি, উল্টো শেখ হাসিনার এই দৃঢ়তা দেশের সাধারণ মানুষের মনে আওয়ামী লীগের প্রতি ইতিবাচক ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনছে।
একই সাথে, ক্ষমতার লোভে বিএনপির এমন গোপন নেগোসিয়েশনের খবর প্রকাশ পাওয়ায় জামায়াত ও এনসিপির সাথে বিএনপির সম্পর্কে ফাটল ধরার উপক্রম হয়েছে। বিএনপির থিঙ্কট্যাংক এখন শঙ্কিত যে, শেখ হাসিনার রাজনৈতিক দূরদর্শিতার কাছে তাদের এই গোপন চাল সম্পূর্ণ ভেস্তে গেছে।
রাজনীতিতে চক্রান্ত বা শর্তের চেয়ে যে আদর্শ ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা বড়—শেখ হাসিনার এই সিদ্ধান্ত তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সাময়িক কোনো সুবিধার জন্য দলের নীতি বিসর্জন না দিয়ে, রাজকীয়ভাবে ও জনগণের ম্যান্ডেট নিয়েই আওয়ামী লীগ আগামী দিনে দেশের রাজনীতিতে তার গৌরবময় অবস্থান পুনরুদ্ধার করবে—এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
