নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা

বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রধান খাদ্যশস্য গমের বাজারে এক ঐতিহাসিক পটপরিবর্তন ঘটে গেছে। যে বাজারে একসময় রাশিয়া, ইউক্রেন কিংবা কানাডার একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল, সেখানে এখন দৃশ্যপটে নাটকীয়ভাবে আবির্ভূত হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

বিশেষ করে সরকারি গমের আমদানির ক্ষেত্রে অন্য সব দেশকে পেছনে ফেলে শতভাগ জায়গা দখল করে নিয়েছে আমেরিকা। এমনকি বেসরকারি খাতেও প্রথমবারের মতো মার্কিন গমের শক্তিশালী উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

এই বড় পরিবর্তনের মূলে রয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা এক বিশেষ ‘বাণিজ্য চুক্তি’। চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ তার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতি বছর অন্তত ৭ লাখ মেট্রিক টন গম যুক্তরাষ্ট্র থেকে কিনতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। মূলত বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করতেই এই কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে: চলতি অর্থবছরে সরকারিভাবে আমদানিকৃত গমের ১০০ শতাংশই এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। বেসরকারি আমদানির প্রায় ১০ শতাংশ এখন যুক্তরাষ্ট্রের দখলে, যা গত বছর ছিল শূন্য।

 একসময় আমদানির ৬২% রাশিয়ার দখলে থাকলেও তা নেমে এসেছে ৩৮ শতাংশে। অন্যদিকে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ইউক্রেন ধারাবাহিকভাবে বাজার হারাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের গম আমদানিতে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছেঅধিক দাম এবং বিশাল পরিবহন খরচ।

খাদ্য মন্ত্রণালয় বলছে, খরচ বেশি হলেও মার্কিন গমের মান নিয়ে কোনো আপস নেই। বিশেষ করে উচ্চ প্রোটিন সমৃদ্ধ এই গম দেশের প্রক্রিয়াজাত খাদ্য শিল্পের জন্য অপরিহার্য।

বিশেষজ্ঞরা এই চুক্তির সমালোচনা করে বলছেন, ব্ল্যাক সি অঞ্চলের তুলনায় মার্কিন গমের দাম ও জাহাজের ভাড়া অনেক বেশি। কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমের মতে:

“বাড়তি দামে গম আমদানির চূড়ান্ত খেসারত দিতে হবে সাধারণ ভোক্তাকে। এটি বাজারে আটা-ময়দার দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।”

 দেশে গমের বার্ষিক চাহিদা: ৮০ – ৮২ লাখ টন।

 স্থানীয় উৎপাদন: মাত্র ১০ – ১২ লাখ টন।

আমদানি লক্ষ্যমাত্রা: চলতি বছর শেষে ৮০ লাখ টন ছাড়াতে পারে।

 যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও এবার নতুন করে তালিকায় যুক্ত হয়েছে আর্জেন্টিনা।

বাণিজ্যিক কূটনীতি নাকি খাদ্য নিরাপত্তা—কোনটি বাংলাদেশের জন্য বেশি লাভজনক হবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে আপাতত দেশের মানুষের রুটি-পরোটার উৎস যে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে আসছে, তা নিশ্চিত।

Leave A Reply

Exit mobile version