চকরিয়া সংবাদদাতা:
কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায় মাতামুহুরী নদীর তীরে এখন আর ফসলের ঘ্রাণ পাওয়া যায় না। তামাকের উৎকট গন্ধে ভারী হয়ে আছে বাতাস। সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চারপাশে। চকরিয়ার অন্তত ১৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ঠিক কোল ঘেঁষেই চলছে তামাকের আবাদ ও চুল্লিতে পাতা শুকানোর কাজ। ফলে বইয়ের পাতার বদলে বিষাক্ত নিকোটিন আর কীটনাশকের ঘ্রাণে বেড়ে উঠছে কয়েক হাজার শিশু।
শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, না তামাকের বিষ?
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বমু বিলছড়ির নাজমা ইয়াছমিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি যেন তামাকের সমুদ্রের মাঝে একফালি দ্বীপ। তিন দিক থেকে তামাকখেত বিদ্যালয়টিকে আষ্টেপৃষ্ঠে ধরেছে। একই চিত্র ডা. গোপাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং পুকপুকুরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও। বিদ্যালয়ের ফটক দিয়ে ঢুকতেই পা মাড়াতে হয় কীটনাশক ছড়ানো তামাকখেতে।
উত্তর কাকারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা জানান, মাত্র ৫০ গজ দূরে থাকা তামাকচুল্লি থেকে নির্গত ধোঁয়া সরাসরি শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করে। তামাক প্রক্রিয়াজাতকরণের মৌসুমে উৎকট গন্ধে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবার দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়।
খাতা-কলমের বদলে হাতে তামাকের পাতা
দরিদ্র পরিবারের অনেক শিশু এই মৌসুমে ক্লাসরুমের পরিবর্তে বাবার সাথে তামাকখেতে শ্রম দিচ্ছে। আট বছর বয়সী এক শিশুকে দেখা গেল তামাকের আঁটির ওপর বসে কাজ করতে। শ্রমিক ভাড়া করার সামর্থ্য না থাকায় তার বাবা তাকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে এসেছেন তামাক কাটার কাজে।
এক শিশু শিক্ষার্থী বলে, “তামাক কাটার সময় স্কুলে যাই না। বাবার সঙ্গে তামাকপাতা কাটি।”
চিকিৎসকদের মতে, এটি সরাসরি ‘গ্রিন টোব্যাকো সিকনেস’এর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জায়নুল আবেদীন জানান, তামাকের নিকোটিন শিশুদের ত্বকের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে বমি ও মাথা ঘোরার মতো সমস্যা তৈরি করে। এছাড়া তামাকের কীটনাশক শিশুদের স্নায়ুতন্ত্র ও শ্বাসতন্ত্রের অপূরণীয় ক্ষতি করছে।
উর্বর মাটি ও পরিবেশে থাবা
তামাকের আগ্রাসন কেবল স্বাস্থ্যের ওপরই নয়, মাটির ওপরও ফেলছে বিরূপ প্রভাব। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহানাজ ফেরদৌসী জানান, তামাক চাষে ব্যবহৃত মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সারের কারণে মাটির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে। পার্শ্ববর্তী বাদাম বা সবজি খেতে ফলন আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে। মাতামুহুরী নদীর পানি ও জলাশয়ে মিশে যাচ্ছে এসব বিষাক্ত রাসায়নিক, যা জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব সংকটে ফেলছে।
তামাক চাষের প্রভাবে, ক্লাসে উপস্থিতির হার হ্রাস ও পড়ার পরিবেশে বিঘ্ন। গ্রিন টোব্যাকো সিকনেস ও দীর্ঘমেয়াদী শ্বাসকষ্ট। উর্বরতা শক্তি হ্রাস ও খাদ্যশস্য উৎপাদনে বাধা। নদী ও জলাশয়ের পানি দূষণ। |
ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস, কিন্তু সমাধান কোথায়?
তামাক কোম্পানিগুলোর ঋণের হাতছানি আর নিশ্চিত আয়ের লোভে কৃষকরা এই মরণঘাতী চাষ ছাড়তে পারছেন না। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজারের সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহর মতে, প্রশাসনের কার্যকর তদারকি না থাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দেয়াল ঘেঁষে তামাকচুল্লি স্থাপনের সাহস পাচ্ছে চাষিরা।
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিষয়টি নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলেও মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।
স্থানীয় অভিভাবক ও পরিবেশবাদীদের দাবি, অবিলম্বে বিদ্যালয়ের সীমানা ঘেঁষে তামাক চাষ নিষিদ্ধ করে আগামী প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা হোক।
