রাজধানী প্রতিবেদক :
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও সংজ্ঞা ঘিরে তুমুল আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই জাতীয় সংসদে কণ্ঠভোটে পাস হলো জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) বিল। বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল—মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলাম পার্টির নাম বহাল রাখা।
বৃহস্পতিবারের অধিবেশনে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান বিলটি উত্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। তবে ঘটনাটিকে নাটকীয় করে তোলে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের আপত্তি এবং স্পিকারের ভিন্ন ব্যাখ্যা।
বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বিলের কয়েকটি ধারার বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে বক্তব্য দিলেও স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ জানান—“বিরোধী দলের নেতা কোনো আপত্তি করেননি।” ফলে আপত্তির ওপর কোনো ভোট গ্রহণ ছাড়াই বিলটি পাস হয়ে যায়।
এ সময় মন্ত্রীর পক্ষ থেকেও বিস্তারিত জবাব না আসায় সংসদে এক ধরনের অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
বিলটিতে ‘মুক্তিযুদ্ধ’, ‘মুক্তিযোদ্ধা’ ও ‘সহযোগী শক্তি’—এই শব্দগুলোর সংজ্ঞায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ রাখা হয়েছে তৎকালীন কিছু রাজনৈতিক দলের নাম।
জামায়াতের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়,
রাজনৈতিক দলকে সরাসরি ‘সহযোগী বাহিনী’ হিসেবে চিহ্নিত করা অনুচিত
সংজ্ঞাগুলো সংশোধন প্রয়োজন
এতে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে
কমিটির প্রতিবেদনে তাদের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ (ভিন্নমত) সংযুক্ত করা হলেও তা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেনি।
শফিকুর রহমান বলেন, “একাত্তরের সেই চরম সময়ে কার কী ভূমিকা ছিল—আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন। আমরা সবাই আংশিক সাক্ষী।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, স্বাধীনতার পর বহুবার গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত হয়েছে এবং ইতিহাসকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।
এদিকে, জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বিলটির প্রতি কোনো আপত্তি নেই বলে স্পিকারকে জানায়। ফলে জোটের ভেতরেই মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
নতুন আইনে—
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের সময়কাল নির্ধারণ
মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতির নির্দিষ্ট মানদণ্ড
পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে লড়াইকে মুক্তিযুদ্ধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা
বিভিন্ন বাহিনী (মুক্তিবাহিনী, ইপিআর, পুলিশ, নৌ কমান্ডোসহ) সদস্যদের স্বীকৃতি নিশ্চিত।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিল শুধু একটি আইনি কাঠামো নয়—বরং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও রাজনৈতিক বয়ান নিয়ে চলমান বিতর্ককে আরও তীব্র করতে পারে।
একদিকে সরকার ইতিহাসের ব্যাখ্যাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চাচ্ছে, অন্যদিকে বিরোধীরা এটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিযোগ করছে।
সংসদে আপত্তি, ভিন্নমত, এমনকি জোটের অভ্যন্তরীণ বিভাজন—সবকিছু ছাপিয়ে শেষ পর্যন্ত কণ্ঠভোটে পাস হয়ে গেল ‘জামুকা’ বিল।

