কুমিল্লা প্রতিনিধি :
অভাব, মানসিক যন্ত্রণা আর অনিশ্চয়তার ভার বইতে না পেরে কুমিল্লার মুরাদনগরে বিষপানে আত্মহত্যা করেছেন এক মা ও তার অবুঝ শিশু কন্যা। হৃদয়বিদারক এই ঘটনাটি যেন আবারও সামনে এনে দিল দেশের নীরব কিন্তু ভয়াবহ এক বাস্তবতা—দারিদ্র্য ও মানসিক সংকটে হারিয়ে যাচ্ছে জীবন।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) ভোররাত আনুমানিক ৪টার দিকে উপজেলার বাঙ্গরা বাজার থানাধীন শ্রীকাইল ইউনিয়নের আলীপুর গ্রামে এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।
নিহতরা হলেন—খাদিজা বেগম (৩০) এবং তার পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে রোকাইয়া। পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, স্বামী হুমায়ুন কবিরের মৃত্যুর পর থেকেই জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করছিলেন খাদিজা।
আর্থিক সংকট, সামাজিক অনিশ্চয়তা এবং মানসিক ভাঙন তাকে ধীরে ধীরে গ্রাস করে।
ঘটনার রাতে মা ও মেয়ে ঘরে একাই ছিলেন। হঠাৎ শিশুটি কান্না শুরু করলে পাশের ঘর থেকে ছুটে আসেন খাদিজার মা রাফিয়া বেগম। দরজা খুলে তিনি দেখেন—মেয়ে ও নাতনি বিষ পান করেছে। দ্রুত তাদের উদ্ধার করে মুরাদনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক দুজনকেই মৃত ঘোষণা করেন।
পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে—দীর্ঘদিনের মানসিক অসুস্থতা এবং চরম অভাব-অনটনই এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের পেছনে মূল কারণ। লাশ ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের নয়; এটি সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা নীরব সংকটের প্রতিচ্ছবি।
বাংলাদেশের বহু অঞ্চলে এখনও হাজারো পরিবার দিন পার করছে—
ন্যূনতম আয়ের নিশ্চয়তা ছাড়াই
চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তার অভাবে
সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর বাইরে থেকে
স্বামী হারানোর পর একজন নারীর জন্য জীবিকা, সন্তান লালন-পালন এবং সামাজিক চাপ—সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি হয়ে ওঠে অসহনীয়। খাদিজার ঘটনাটি সেই বাস্তবতার নির্মম উদাহরণ।
অবহেলার অন্ধকারে গ্রামাঞ্চলে মানসিক স্বাস্থ্য এখনো এক প্রকার ‘অদৃশ্য সংকট’।
অনেকেই মানসিক অসুস্থতাকে রোগ হিসেবে না দেখে “ব্যক্তিগত দুর্বলতা” হিসেবে বিবেচনা করেন। ফলে—
চিকিৎসা নেওয়া হয় না
পরিবারও গুরুত্ব দেয় না
সমস্যার গভীরতা বাড়তেই থাকে
ফলাফল—একসময় তা পরিণত হয় এমন মর্মান্তিক পরিণতিতে।
বর্তমান সময়ে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক বৈষম্য অনেক পরিবারকে ঠেলে দিচ্ছে চরম হতাশার দিকে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “অর্থনৈতিক চাপ ও মানসিক চাপ একসাথে কাজ করলে আত্মহত্যার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।”
খাদিজা ও তার ছোট্ট মেয়ের মৃত্যু আমাদের সামনে কিছু কঠিন প্রশ্ন রেখে যায়—
কেন একজন অসহায় মা সাহায্য পাওয়ার আগেই এমন সিদ্ধান্ত নিলেন?
কোথায় ছিল সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা?
কেন মানসিক স্বাস্থ্য এখনও উপেক্ষিত?
অভাব শুধু পেটের ক্ষুধা নয়—এটি ধীরে ধীরে মানুষকে মানসিকভাবে ভেঙে দেয়, আশাহীন করে তোলে।
কুমিল্লার এই ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—
অর্থনৈতিক সহায়তা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক সচেতনতা—এই তিনটি ছাড়া এমন ট্র্যাজেডি থামানো সম্ভব নয়।

