নিজস্ব প্রতিবেদক :
ধানের জমিতে পানি নেই, সেচযন্ত্র কাঁধে নিয়ে ফিলিং স্টেশনে ছুটছেন চাষিরা—রাজশাহীর এই দৃশ্য এখন ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশে। জ্বালানি সংকট শুধু কৃষি নয়, পুরো জনজীবনকেই ঠেলে দিচ্ছে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে।
রাজশাহীর পবা উপজেলার নওহাটায় দেখা গেছে, কৃষকরা শ্যালোমেশিন (সেচযন্ত্র) নিয়ে ফিলিং স্টেশনের সামনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পর মিলছে মাত্র ২০০ টাকার তেল—যা দিয়ে একটি সেচযন্ত্র তিন ঘণ্টার বেশি চালানো সম্ভব নয়। অথচ একটি জমিতে সেচ দিতে প্রয়োজন অন্তত ৮-৯ ঘণ্টা।
৬৫ বছর বয়সী কৃষক জমেলা বেগমের মতো অনেকেই বলছেন, “১০ দিন ধরে জমিতে পানি দিতে পারিনি। জমি শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।” অন্যদিকে কৃষক রাকিব হোসেনের কণ্ঠে হতাশা—“প্রতিদিন অল্প অল্প তেল কিনে কোনোভাবে সেচ দিচ্ছি, কিন্তু এতে খরচ বাড়ছে, ফলন নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে।”
বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম ভরসা বোরো ধান। এই মৌসুমে নিয়মিত সেচ না পেলে ধানের কুশি গঠন ও শীষ বের হওয়া ব্যাহত হয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে ফলনে। ইতোমধ্যে রাজশাহী অঞ্চলে ৩ লাখ ৬৫ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হলেও জ্বালানি সংকটে সেচ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, সময়মতো সেচ না হলে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়বে। এর প্রভাব পড়বে জাতীয় খাদ্য মজুত ও বাজার ব্যবস্থায়।
তেলের দামে অস্থিরতা, বাজারে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি
সরকারি ফিলিং স্টেশনে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি প্রায় ১০১ টাকা হলেও খোলা বাজারে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩০-১৪০ টাকায়। অনেক জায়গায় টাকা দিয়েও তেল পাওয়া যাচ্ছে না। এই সংকট শুধু কৃষকদের নয়—পরিবহন, শিল্প, ক্ষুদ্র ব্যবসা—সব ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানির এই অস্থিরতা সরাসরি প্রভাব ফেলবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে। পরিবহন খরচ বাড়লে বাজারে চাল, ডাল, সবজি থেকে শুরু করে সবকিছুর দাম বাড়বে।
জনজীবনে স্থবিরতা,
তেলের সংকটের কারণে গ্রামাঞ্চলে সেচযন্ত্র বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, শহরে কমছে যানবাহনের সংখ্যা। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ ঘাটতি থাকায় বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত ডিজেলচালিত জেনারেটরও চালানো যাচ্ছে না।
ফলে ধীরে ধীরে স্থবির হয়ে পড়ছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। কর্মসংস্থান, উৎপাদন, সরবরাহ—সবকিছুই পড়ছে চাপে।
সামনে আরও ভয়াবহ সংকট?
কৃষক ও সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। বোরো মৌসুম ব্যাহত হলে খাদ্য উৎপাদন কমে যেতে পারে, যার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে পুরো অর্থনীতিতে পড়বে।
অন্যদিকে তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে পানির চাহিদা আরও বাড়ছে। এতে সেচের ওপর নির্ভরতা বাড়লেও জ্বালানি সংকট সেই চাহিদা পূরণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রশাসনের আশ্বাস, মাঠে বাস্তবতা ভিন্ন
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং কৃষকদের জন্য জ্বালানি নিশ্চিত করতে কাজ চলছে। তবে মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে—যেখানে কৃষকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও প্রয়োজনীয় তেল মিলছে না।
সারা দেশে জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করছে
কৃষি উৎপাদন বিশেষ করে বোরো ধান ঝুঁকির মুখে
তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সব পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা
জনজীবন ধীরে ধীরে স্থবির হয়ে পড়ছে
দ্রুত সমাধান না এলে সামনে আরও বড় অর্থনৈতিক সংকট
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই জ্বালানি সংকট একটি পূর্ণাঙ্গ খাদ্য ও অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে—যার প্রভাব ভোগ করতে হবে দেশের প্রতিটি মানুষকে।

