স্টাফ রিপোর্টার | পাবনা
সারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই এবার ডিজেল সংকটের চাপে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন পাবনার কৃষকরা।
বোরো মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে টাকা নিয়েও ডিজেল না পেয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন তারা। ফলে জমিতে সেচ দেওয়া, চারা রোপণ—সবকিছুই হয়ে উঠছে অনিশ্চিত।
পাবনা শহরের অনন্তবাজার এলাকার পেট্রল পাম্পগুলোতে ভোর থেকে ভিড় করছেন কৃষকরা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও অনেকেই ফিরছেন খালি হাতে। আবার কেউ কেউ বাধ্য হয়ে খুচরা দোকান থেকে লিটারপ্রতি ৫০-৬০ টাকা বেশি দামে অল্প পরিমাণ ডিজেল কিনছেন, যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল।
চর সাদিপুরের কৃষক আলামিন বলেন, “৫-১০ লিটার তেল পেতে দুই-তিন ঘণ্টা বসে থাকতে হয়। আবার দুই দিন পর এসে একই অবস্থা। এভাবে চাষ করা সম্ভব না।”
একই এলাকার তয়েব মোল্লার কণ্ঠেও হতাশা, “ধানের বয়স ১৫ দিন। এখন সেচ না দিলে ফলন নষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু চাহিদামতো ডিজেলই পাচ্ছি না।”
কৃষকদের হিসাব বলছে, এক বিঘা জমিতে মৌসুমজুড়ে প্রায় ৫০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন, যার খরচ দাঁড়ায় ৫-৬ হাজার টাকা। কিন্তু সংকটের কারণে খোলা বাজার থেকে কিনতে গেলে অতিরিক্ত ২-৩ হাজার টাকা গুনতে হচ্ছে। অন্যদিকে ধানের দাম কম থাকায় লাভের পরিবর্তে লোকসানের আশঙ্কাই বেশি।
চর সদিরাজপুরের কৃষক হাসান বলেন, “সব খরচ মিলিয়ে ১৮-২০ হাজার টাকা লাগে। ধান বিক্রি করে যা পাই, তাতে লাভ তো দূরের কথা—খরচই উঠে না। এবার কী হবে, জানি না।”
চাটমোহরের কৃষক আব্দুল হাকিম জানান, শুধু জমি চাষের খরচই বেড়ে গেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। “গত বছর যেখানে ৩৫০ টাকায় এক বিঘা জমি চাষ হয়েছে, এবার সেখানে ৪৫০ টাকা লাগছে। ডিজেল না থাকায় খরচ আরও বাড়ছে,” বলেন তিনি।
এদিকে পাম্প মালিকরা বলছেন, সরবরাহের তুলনায় চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় সংকট তীব্র হয়েছে। অনন্তবাজার এলাকার একটি পাম্পের ব্যবস্থাপক জানান, “আগে দিনে ৪-৫ হাজার লিটার ডিজেল লাগত। এখন সবাই একসঙ্গে আসায় যতই তেল আসছে, দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে।”
জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এবার পাবনায় ৫৬ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে, যার বড় একটি অংশ ডিজেলচালিত সেচের ওপর নির্ভরশীল। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশ্বস্ত করে বলছেন, পরিস্থিতি শিগগিরই স্বাভাবিক হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, “কৃষকদের ভোগান্তি কমাতে পাম্পে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আমরা আশা করছি, খুব দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি হবে।”
তবে মাঠের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। সারের উচ্চমূল্য আর ডিজেলের সংকট—দ্বৈত চাপে পড়া কৃষকদের চোখে এখন একটাই প্রশ্ন, “এভাবে কি আর চাষাবাদ টিকবে?”

