❐ নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানী যেন এখন মশার নগরী। দিনশেষে ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাসায় ফিরেও স্বস্তি নেই—সন্ধ্যা নামলেই শুরু হয় মশার ঝাঁকে ঝাঁকে আক্রমণ। বাসা, দোকান, অফিস—কোথাও যেন রেহাই নেই। মশার তীব্র উপদ্রবে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে নগরবাসী, আর এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগের ভয়াবহ আতঙ্ক।
তেজকুনিপাড়া এলাকার টং দোকানি মিজানুর রহমানের কণ্ঠে অসহায়ত্ব,
“সারাদিন দোকানে বসে থাকা যায় না। সন্ধ্যা হলেই মনে হয় যুদ্ধ শুরু হয়। দুই পাশে কয়েল জ্বালিয়েও মশার হাত থেকে বাঁচতে পারি না।”
শুধু তেজকুনিপাড়া নয়—রামপুরা, মগবাজার, মিরপুর, মোহাম্মদপুর—রাজধানীর প্রায় প্রতিটি এলাকাতেই একই চিত্র।
রামপুরার বাসিন্দা অশোক দে বলেন,
“মশার জন্য ঘরে থাকা দায় হয়ে গেছে। বাজারে ইলেকট্রিক ব্যাট বা মেশিনও পাওয়া যাচ্ছে না—চাহিদা এত বেশি!”
মগবাজারের নুসরাত ফাতেমার অভিযোগ,
“সিটি কর্পোরেশন মাঝে মাঝে ফগিং করে, কিন্তু এতে কোনো কাজ হয় না। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আগের অবস্থা ফিরে আসে।”
মশার উপদ্রব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডেঙ্গুর ভয়ও বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন—বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আনলে এটি দ্রুত জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিতে পারে। হাসপাতালগুলোতে ইতোমধ্যেই জ্বর ও ভাইরাসজনিত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে বলে জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি কারণে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে—
দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়ায় ড্রেন ও জলাশয়ে স্থির পানি জমে থাকা
অপরিষ্কার ড্রেন, খাল ও বক্স-কালভার্ট
তাপমাত্রা বৃদ্ধি, যা মশার বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল
মশক নিধন কার্যক্রমে অনিয়ম ও অবহেলা
স্থির, পচা পানিই এখন মশার প্রধান প্রজননকেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
আইনি নোটিশ, তবুও কার্যকর পদক্ষেপের অভাব
মশার এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে এক আইনজীবী স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও সিটি কর্পোরেশনকে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে কার্যকর উদ্যোগের অভাবই বেশি চোখে পড়ছে বলে অভিযোগ নগরবাসীর।
এই পরিস্থিতি শুধু সিটি ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা নয়, বরং দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যখাতের দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে।
হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত বেড ও সেবার সংকট
জনসচেতনতা কার্যক্রমের অভাব
প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার দুর্বল বাস্তবায়ন
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “শুধু ফগিং করে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।”
দুই সিটি কর্পোরেশন সম্প্রতি ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’সহ বিভিন্ন উদ্যোগের কথা জানালেও, বাস্তবে এর সুফল পাচ্ছে না সাধারণ মানুষ। অনেক এলাকাতেই নিয়মিত ওষুধ ছিটানো বা ড্রেন পরিষ্কারের কার্যক্রম দেখা যায় না।
নগরবাসীর দাবি
নিয়মিত ও কার্যকর মশক নিধন কার্যক্রম
ড্রেন ও জলাশয় পরিষ্কার রাখা
আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার
স্বাস্থ্যখাতে জরুরি প্রস্তুতি
বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে এটি কেবল নগর সমস্যা নয়—সারাদেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকিতে পরিণত হতে পারে। এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে মশার এই ছোট আক্রমণই বড় বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে—এমন আশঙ্কাই করছেন সচেতন মহল।
নগরবাসীর প্রশ্ন এখন একটাই—“আর কতদিন এই মশার কাছে জিম্মি থাকতে হবে?”

