টিসিবির ট্রাকে উপচে পড়া ভিড়: নীরব দুর্ভিক্ষের ইঙ্গিত দিচ্ছে কি বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা?

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা

রমজান মাস উপলক্ষে সারা দেশে কম দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রির কার্যক্রম শুরু করেছে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। ঢাকা মহানগরীসহ বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় ট্রাকে করে তেল, চিনি, ডাল, ছোলা ও খেজুর বিক্রি করা হচ্ছে। তবে এসব ট্রাক ঘিরে যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা সাধারণ ভর্তুকিপণ্য বিক্রির দৃশ্যকে ছাড়িয়ে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে।


সরজমিনে দেখা গেছে, টিসিবির ট্রাকের পেছনে শত শত মানুষ দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। কোথাও কোথাও পণ্য নিতে গিয়ে হাতাহাতি, ধাক্কাধাক্কি ও বিশৃঙ্খলার ঘটনাও ঘটছে। অতিরিক্ত ভিড় সামাল দিতে না পেরে কয়েকটি স্থানে পণ্য বিতরণ বন্ধ করে ট্রাক দ্রুত স্থান ত্যাগ করেছে। এতে নারী ও শিশুদের দৌড়াদৌড়ি, এমনকি ভিড়ের চাপে পড়ে আহত হওয়ার ঘটনাও প্রত্যক্ষ করা গেছে।


টিসিবির নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী একজন ক্রেতার জন্য যে পরিমাণ পণ্য বরাদ্দ থাকে, অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই তা অর্ধেক করে দেওয়া হচ্ছে। তবুও বহু মানুষ খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন। পণ্য সংকটের আশঙ্কায় ক্রেতারা আগে পণ্য পাওয়ার জন্য ভিড় ঠেলে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলছে।
টিসিবির একজন অভিজ্ঞ ডিলার জানান, তিনি রাজধানীর কারওয়ান বাজার এলাকায় প্রায় ১২ বছর ধরে টিসিবির পণ্য বিক্রি করছেন। তার ভাষায়, “গত দুই বছরে যে চাপ দেখছি, তা আগের দশ বছরে কখনো দেখিনি। একজনের জন্য বরাদ্দ পণ্য তিনজনকে ভাগ করে দিচ্ছি, তবুও বেশিরভাগ মানুষ খালি হাতে ফিরছে।”
তিনি আরও জানান, পূর্বে টিসিবির ট্রাকের সামনে মূলত নিম্নআয়ের মানুষই লাইনে দাঁড়াতেন। মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ এই লাইনে দাঁড়াতে সামাজিক লজ্জাবোধ করতেন। কিন্তু বর্তমানে বাজারে নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য এবং মানুষের হাতে নগদ অর্থের ঘাটতির কারণে মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যদেরও টিসিবির লাইনে দাঁড়াতে দেখা যাচ্ছে।


আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পণ্য বিক্রি করেও অনেক সময় ট্রাকের মাল শেষ হতো না। অথচ এখন ট্রাক আসার দুই থেকে তিন ঘণ্টার মধ্যেই সব পণ্য শেষ হয়ে যাচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, গত দুই বছরে বিশেষ করে জুলাই আন্দোলনের পর নতুন সরকারের সময়ে সারা দেশে সহস্রাধিক কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে বিপুল সংখ্যক মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়ে নিম্নআয়ের শ্রেণিতে নেমে এসেছে। আগে সীমিত আয়ের মধ্যেও যাদের জীবন চলত, তারা এখন আয়ের পথ হারিয়ে খণ্ডকালীন বা অনানুষ্ঠানিক কাজে যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছেন।


এর পাশাপাশি গত দেড় বছরে নিত্যপণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে চরম চাপে ফেলেছে। সংসার চালাতে হিমশিম খাওয়া মানুষগুলো কম দামে পণ্য পাওয়ার আশায় টিসিবির ট্রাকের সামনে ভিড় করছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *