‘জয় বাংলা’: বাঙালির আত্মপরিচয় ও স্বাধীনতার ঐতিহাসিক উচ্চারণ

বাংলার ইতিহাসে কিছু শব্দ আছে, যা কেবল উচ্চারণ নয় অস্তিত্বের ঘোষণা। ‘জয় বাংলা’ তেমনই এক স্লোগান। এটি ছিল বাঙালির আত্মপরিচয়ের ভাষা, সংগ্রামের শপথ, মুক্তির আহ্বান। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের দীর্ঘদিনের শোষণ, বৈষম্য ও অবিচারের বিরুদ্ধে বাঙালির যে সশস্ত্র ও অসহযোগ আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তার প্রাণস্পন্দন হয়ে উঠেছিল এই দুটি শব্দ।

‘জয় বাংলা’ স্লোগানের শিকড় খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হয় ১৯২০-এর দশকে। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৯২২ সালে বহরমপুর জেলে বন্দী অবস্থায় ‘পূর্ণ অভিনন্দন’ কবিতায় লিখেছিলেন-“জয় বাংলার পূর্ণচন্দ্র, জয় জয় আদি-অন্তরীণ!জয় যুগে-যুগে-আসা-সেনাপতি, জয় প্রাণ আদি-অন্তহীন!”কবিতাটি উৎসর্গ করা হয়েছিল ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামী পূর্ণচন্দ্র দাসকে। পরে এটি ১৯২৪ সালে তাঁর কাব্যগ্রন্থ ভাঙার গান-এ প্রকাশিত হয়। যদিও তখন ‘জয় বাংলা’ রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি, তবু শব্দদ্বয়ের ভেতরে যে জাতীয় চেতনার আগুন লুকিয়ে ছিল, তা সময়ের অপেক্ষায় ছিল।১৯৪২ সালে ‘বাঙালির বাংলা’ প্রবন্ধে নজরুল আবারও লিখেছিলেন “বাংলা বাঙালির হক, বাংলার জয় হক, বাঙালির জয় হক।” এ ছিল ভাষা ও ভূখণ্ডের অধিকার রক্ষার স্পষ্ট উচ্চারণ।১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হলেও পূর্ব বাংলার মানুষের কাছে প্রকৃত স্বাধীনতা আসেনি। পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য ক্রমশ স্পষ্ট হতে থাকে।

ভাষা আন্দোলন থেকে ছয় দফা সব আন্দোলনের অন্তর্নিহিত শক্তি হয়ে উঠতে থাকে বাঙালি জাতীয়তাবাদ।১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত গোপন সংগঠন ‘স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াস’ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ ‘জয় বাংলা’কে স্লোগান হিসেবে সামনে আনে। ১৯৬৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর মধুর ক্যান্টিনে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভায় প্রথম উচ্চারিত হয় ‘জয় বাংলা’। এই স্লোগান দ্রুত ছাত্রসমাজ ও জনতার মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে।১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’কে প্রতিস্থাপন করে সর্বত্র উচ্চারিত হতে থাকে ‘জয় বাংলা’।১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ শেষ করেন “জয় বাংলা” বলে। সেই মুহূর্তে স্লোগানটি হয়ে ওঠে স্বাধীনতার অঘোষিত ঘোষণা।১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে তাঁর ভাষণ শেষ করেন “জয় বাংলা, জয় স্বাধীন বাংলাদেশ।”

মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় জুড়ে এই স্লোগান মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল জুগিয়েছে, শরণার্থী শিবির থেকে যুদ্ধক্ষেত্র সবখানে এটি ছিল বিজয়ের প্রত্যয়।দীর্ঘ পাঁচ দশক পর জননেত্রী শেখ হাসিনার উদ্যেগে নেন জয় বাংলা স্লোগান কে রাষ্ট্রীয় স্লোগানের মর্যাদা দিবেন । তারই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার ২০২২ সালের ২ মার্চ সংসদে দাবি উত্থাপিত করলে সর্বসম্মতিক্রমে ‘জয় বাংলা’কে জাতীয় স্লোগান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তবে বাস্তবে এটি ১৯৭১ সাল থেকেই জাতির হৃদয়ে সেই মর্যাদা ধারণ করে আছে।‘জয় বাংলা’ কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি একটি ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার প্রতীক নজরুলের কলম থেকে বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠ, ছাত্রসমাজের মিছিল থেকে মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গন পর্যন্ত। এই শব্দদ্বয় আমাদের মনে করিয়ে দেয় একটি জাতির আত্মপরিচয় কখনো দমিয়ে রাখা যায় না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *