গণভোটের গননায় অসংগতি: মূল ভোটের বৈধতা নিয়েও শংকা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ফল প্রকাশের পর থেকেই সংখ্যার ভেতরে অস্বাভাবিক গরমিল নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (ইসি) বলছে, মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ২ হাজার ৩৩৪ জনের মধ্যে ৬০.২৬ শতাংশ গণভোটে অংশ নিয়েছেন। ‘হ্যাঁ’ পেয়েছে ৪ কোটি ৮০ লাখের বেশি ভোট, ‘না’ পেয়েছে ২ কোটি ২৫ লাখের বেশি। কিন্তু এই হিসাবের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছে মাঠপর্যায়ের তথ্য।২৪৪ শতাংশ ভোট! গণতন্ত্র না গণিতের ব্যর্থতা?সবচেয়ে বিস্ময়কর উদাহরণ এসেছে রাজশাহী অঞ্চলের রাজশাহী-৪ আসন থেকে। সেখানে মোট ভোটার ৩ লাখ ১৯ হাজার ৯০৯ জন, অথচ কাস্টিং ভোট দেখানো হয়েছে ৭ লাখ ৮১ হাজার ৫২৩টি অর্থাৎ ২৪৪.২৯৫ শতাংশ!এটি কি টাইপো? নাকি ভোট গণনার নামে প্রকাশ্য প্রহসন?এই আসনে ‘না’ ভোট পেয়েছে ৬ লাখের বেশি। নির্বাচিত সংসদ সদস্য বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী–সমর্থিত প্রার্থী। প্রশ্ন হলো মোট ভোটারের চেয়েও দ্বিগুণ ভোট পড়ে কীভাবে?কোথাও ২৪৪%, কোথাও ৭.৮৯৯% এই দ্বিমুখী বাস্তবতা কেন?সিরাজগঞ্জ-১ আসনে গণভোটে অংশগ্রহণ দেখানো হয়েছে মাত্র ৭.৮৯৯ শতাংশ। অথচ একই দিনে সংসদ নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৬০.৮৩ শতাংশ!একই ভোটার, একই দিন, একই কেন্দ্রে কিন্তু অংশগ্রহণে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। এটা কি প্রশাসনিক অদক্ষতা, নাকি ইচ্ছাকৃত সংখ্যা বিন্যাস?নেত্রকোনায় ভোটারের চেয়ে ‘হ্যাঁ’ বেশি!নেত্রকোনা-৩ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ২০ হাজার ৬৮৬ জন। অথচ ‘হ্যাঁ’ ভোট দেখানো হয়েছে ৫ লাখ ২ হাজার ৪৩৮টি যা মোট ভোটারের সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে।কিন্তু একই প্রতিবেদনে প্রদত্ত মোট ভোট দেখানো হয়েছে ২ লাখ ৩৮ হাজার!একই রিপোর্টে তিন ধরনের সংখ্যা কোনটি সত্য?নেত্রকোনা-৪ ও ৫ আসনেও একই ধরনের অসঙ্গতি দেখা গেছে। এটি বিচ্ছিন্ন ভুল নয়; বরং পদ্ধতিগত ত্রুটির ইঙ্গিত।১১ আসনে ‘না’ জয়ী: রাজনৈতিক বার্তা নাকি ফলাফল নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতা?২৯৯টি আসনের মধ্যে ১১টিতে ‘না’ জয়ী হয়েছে। পার্বত্য তিন জেলা ও গোপালগঞ্জ জেলার তিন আসনেই ‘না’ এগিয়ে।বিশেষত গোপালগঞ্জ, যা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ–এর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত, সেখানে ‘না’ তিনগুণ ব্যবধানে এগিয়ে এটি নিছক ভোটের ফল, নাকি জনমতের অদৃশ্য পরিবর্তন?অন্যদিকে ‘না’ জয়ী ১১ আসনের মধ্যে ১০টিতেই জয়ী প্রার্থী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সমর্থিত। রাজনৈতিক সমীকরণ ও গণভোটের ফলের এই মিল কি কাকতালীয়?টিবিএসের অনুসন্ধান: গরমিলের পর্দা উন্মোচনফলাফল বিশ্লেষণ করে অসঙ্গতির বিষয়টি সামনে এনেছে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (টিবিএস)। তাদের পর্যবেক্ষণ বলছে প্রকাশিত ফলাফলে সংখ্যাগত অসামঞ্জস্য কেবল এক-দুইটি আসনে নয়, একাধিক স্থানে বিদ্যমান।চূড়ান্ত প্রশ্নগণভোটের ফলাফল বলছে ‘হ্যাঁ’ পেয়েছে ৬২.৪৭ শতাংশ ভোট। কিন্তু যখন কোনো আসনে ভোট পড়ে ২৪৪ শতাংশ, আবার কোথাও ৮ শতাংশেরও কম তখন সেই ৬২ শতাংশের বিশ্বাসযোগ্যতা কোথায় দাঁড়ায়?গণতন্ত্র কেবল ফলাফলের নাম নয়; প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাই তার প্রাণ।সংখ্যা যদি আস্থা হারায়, তবে বিজয়ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়।এখন প্রশ্ন একটাই- এটি কি কাগজের ভুল, নাকি গণতন্ত্রের গঠনগত সংকট?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *