“Reciprocal Trade” নাকি নীতিগত আত্মসমর্পণ? যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ চুক্তির নথি ঘিরে বিস্ফোরক প্রশ্ন!

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হঠাৎ করেই ছড়িয়ে পড়েছে “Agreement between the United States of America and the People’s Republic of Bangladesh on Reciprocal Trade” শীর্ষক ৩২ পৃষ্ঠার একটি চুক্তিপত্রের স্ক্রিনশট। বিষয়টি ঘিরে তৈরি হয়েছে আলোচনা, উদ্বেগ ও বিভ্রান্তি।অনুসন্ধানে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি সংস্থা United States Trade Representative (USTR) এর ওয়েবসাইটে “Agreements on Reciprocal Trade” শিরোনামের অধীনে এমন একটি নথি পাওয়া যাচ্ছে। তবে চুক্তির কার্যকারিতা, স্বাক্ষরের তারিখ এবং বাস্তবায়নের অবস্থা সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা এখনো স্পষ্ট নয়।বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি কেবল একটি বাণিজ্য চুক্তি নয়; বরং এর প্রভাব পড়তে পারে কৃষি, শ্রমনীতি, ডিজিটাল খাত, জ্বালানি নিরাপত্তা এমনকি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতেও।

চুক্তির Section 2 অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কঠোর লাইসেন্সিং বা পরীক্ষামূলক শর্ত আরোপ করতে পারবে না। মার্কিন ল্যাবরেটরির সার্টিফিকেটকে চূড়ান্ত হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতে, এতে আমদানি প্রক্রিয়া সহজ হবে। তবে অন্যদের আশঙ্কা, পণ্যের মান ও নিরাপত্তা যাচাইয়ে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা সীমিত হতে পারে।চুক্তিতে বলা হয়েছে, “science-based” কারণ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্যে স্যানিটারি বা স্বাস্থ্যগত বাধা দেওয়া যাবে না। চিজ ও মাংসের নির্দিষ্ট নাম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞাও দেওয়া যাবে না।কৃষি বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন ভর্তুকিপ্রাপ্ত কৃষিপণ্য ও জিএমও শস্য সহজে প্রবেশ করলে স্থানীয় কৃষক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারেন। যদিও সরকারপক্ষের ধারণা বাজার উন্মুক্ত হলে ভোক্তারা কম দামে পণ্য পেতে পারেন।চুক্তিতে শ্রম আইন সংশোধন, ট্রেড ইউনিয়ন গঠন সহজ করা এবং ইপিজেডে পূর্ণ ইউনিয়ন স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।

শ্রম অধিকারকর্মীরা এটিকে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন। তবে তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় প্রভাব পড়তে পারে।Section 3 অনুযায়ী, ডিজিটাল সেবার ওপর শুল্ক আরোপ করা যাবে না এবং সংগৃহীত ডেটা বিদেশে স্থানান্তরে বাধা দেওয়া যাবে না।আইটি খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে “data localization” নীতি বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে। ফলে নাগরিকদের তথ্য সুরক্ষা ও কর আদায়ের সম্ভাবনা সীমিত হতে পারে।চুক্তির Section 4–এ উল্লেখ রয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র কোনো দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে বাংলাদেশকেও তা অনুসরণ করতে হবে। এছাড়া নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তৃতীয় দেশের সঙ্গে বাণিজ্য সীমিত করার ইঙ্গিত রয়েছে।পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষকদের মতে, এতে বাংলাদেশের কৌশলগত ভারসাম্য নীতি প্রভাবিত হতে পারে। বিশেষ করে চীন বা রাশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে চাপ তৈরি হতে পারে।চুক্তির Annex-এ বিমান, এলএনজি, গম, সয়াবিন ও তুলা নির্দিষ্ট পরিমাণে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনার কথা উল্লেখ রয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ, ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের এলএনজি এবং নির্দিষ্ট সংখ্যক বোয়িং বিমান কেনার প্রসঙ্গ এসেছে।অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতে, এটি “market access” এর বিনিময়ে নির্দিষ্ট পণ্য ক্রয়ের প্রতিশ্রুতি। অন্যদিকে সমালোচকদের দাবি, এটি কার্যত চাপিয়ে দেওয়া বাণিজ্য।Section 6–এ বলা হয়েছে, চুক্তির শর্ত ভঙ্গ হয়েছে বলে মনে করলে যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় উচ্চ শুল্ক আরোপ করতে পারবে।এখানেই সবচেয়ে বড় বিতর্ক। সমালোচকদের মতে, প্রয়োগ ক্ষমতা একপাক্ষিক হলে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে।

এই চুক্তি কি বাংলাদেশের জন্য নতুন রপ্তানি সুযোগ তৈরি করবে, নাকি নীতিগত ও কৌশলগত নির্ভরশীলতা বাড়াবে তা এখনো স্পষ্ট নয়।সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা, সংসদীয় আলোচনা এবং পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ ছাড়া চুক্তির প্রকৃত প্রভাব নির্ধারণ করা কঠিন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।বাণিজ্যিক সুবিধা বনাম নীতিগত সার্বভৌমত্ব এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *