গণভোটের মুখোশে স্বৈরশাসন: সেকাল থেকে এইকাল

বিশ্লেষণ | Infobangla

পূর্ব পাকিস্তান থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ—এই ভূখণ্ডের রাজনৈতিক ইতিহাসে গণভোট বারবার ব্যবহার হয়েছে ক্ষমতা বৈধ করার একটি প্রশাসনিক কৌশল হিসেবে। ঘোষিত ফলাফলে বিপুল সমর্থনের চিত্র দেখা গেলেও, জনআস্থার বিচারে এসব গণভোট কখনোই স্থায়ী রাজনৈতিক বৈধতা অর্জন করতে পারেনি। ইতিহাসে একটি স্পষ্ট প্যাটার্ন বারবার ফিরে আসে—সংখ্যার জোরে “হ্যাঁ”, কিন্তু বাস্তবে জনগণের অনাস্থা।

১৯৬০ সালে সামরিক শাসক আইয়ুব খানের আয়োজিত গণভোটে সরকারিভাবে ৯৫ শতাংশের বেশি সমর্থনের দাবি করা হয়। তবে এই ভোটে সরাসরি জনগণের অংশগ্রহণ ছিল না; ভোটাধিকার সীমাবদ্ধ ছিল নিয়ন্ত্রিত ‘Basic Democrats’ কাঠামোর প্রতিনিধিদের মধ্যে। পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক মহলে এটি গণইচ্ছার প্রতিফলন হিসেবে নয়, বরং সামরিক শাসনকে বৈধ করার একটি কাগুজে প্রক্রিয়া হিসেবেই বিবেচিত হয়। ফলাফল যতই শক্তিশালী দেখাক না কেন, জনঅসন্তোষ দমাতে পারেনি; বরং এই সময় থেকেই রাজনৈতিক প্রতিরোধ তীব্র হয়ে ওঠে, যা শেষ পর্যন্ত গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়।

স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসেও একই চিত্র দেখা যায়। ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমানের আস্থা গণভোটে প্রায় ৯৯ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট এবং প্রায় ৮৮ শতাংশ উপস্থিতির সরকারি দাবি করা হয়। ১৯৮৫ সালে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের গণভোটে সরকারিভাবে প্রায় ৯৪ শতাংশ সমর্থনের ঘোষণা আসে। সংখ্যাগুলো ছিল অভূতপূর্ব, কিন্তু বিরোধী দলগুলোর বয়কট, ভোটের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন এবং রাজনৈতিক অবিশ্বাস এসব গণভোটকে জনসম্মত ঐকমত্যে পরিণত করতে পারেনি। বরং এসব সময়েই আন্দোলন জোরদার হয়েছে এবং শাসনব্যবস্থার প্রতি জনগণের সংশয় আরও গভীর হয়েছে।

এই পরিসংখ্যানগুলো একটি বাস্তব সত্য সামনে আনে—ঘোষিত বিপুল সমর্থন ইতিহাসে স্থায়ী জায়গা নিশ্চিত করে না। যখন গণভোট জনগণের বিস্তৃত অংশগ্রহণ, আস্থা ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা অর্জনে ব্যর্থ হয়, তখন তার ফল প্রশাসনিকভাবে টিকে থাকলেও জনমানসে গ্রহণযোগ্যতা হারায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এমন গণভোটগুলো রাজনৈতিক স্মৃতির প্রান্তে সরে যায়।

এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের প্রস্তাবিত গণভোটকে অনেক বিশ্লেষক আর নিছক ভোট হিসেবে দেখছেন না। Infobangla–এর পর্যবেক্ষণে, এটি বরং একটি পূর্বনির্ধারিত রাজনৈতিক নাটকের রিহার্সাল বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। সমালোচকদের দাবি, ফলাফল যাই হোক না কেন—‘হ্যাঁ’ জয়ী হবে, আর জনগণের প্রকৃত মতামত উপেক্ষিতই থেকে যাবে। অভিযোগ উঠেছে, সেনাবাহিনী, আনসার ও প্রশাসনিক কাঠামোকে ব্যবহার করে একটি নির্বাচনী ইঞ্জিনিয়ারিং প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে, যেন ফলাফল আগেভাগেই নির্ধারিত থাকে।

পূর্ব পাকিস্তানে আইয়ুব খানের তথাকথিত ‘Basic Democracy’ ব্যবস্থার যে রাজনৈতিক নাটক শেষ পর্যন্ত বাংলার মাটিতে ভেঙে পড়েছিল, তার ধারাবাহিকতাতেই আজ ‘সংস্কার’-এর নামে নতুন কৌশল প্রয়োগের অভিযোগ উঠছে। তবে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—যতই সাজানো প্রক্রিয়া হোক না কেন, জনগণের চোখ বন্ধ করে রাখা যায় না।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল প্রশাসনিক শক্তির প্রদর্শন নয়; বরং গণতন্ত্রের নামে জনগণের আস্থা আত্মসাতের একটি রাজনৈতিক কৌশল। ভোটের পদ্ধতি, অংশগ্রহণের কাঠামো এবং রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা—সবকিছু এমনভাবে সাজানো হচ্ছে যেন ‘হ্যাঁ’ ফলাফল আগে থেকেই নিশ্চিত থাকে।

Infobangla মনে করে, ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে—যে গণভোট জনগণের বিশ্বাস অর্জনে ব্যর্থ হয়, তা কাগজে টিকে থাকলেও বাস্তবের মাটিতে টেকে না। আইয়ুব খান থেকে শুরু করে পরবর্তী সামরিক ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক শাসকেরা এই সত্য অতিক্রম করতে পারেননি। শক্তির ওপর দাঁড়ানো বৈধতা শেষ পর্যন্ত জনগণের অসহযোগিতা ও ইতিহাসের কঠিন বিচারের মুখেই পড়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *