শীত মৌসুমজুড়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গ্যাস সংকটের কারণে রান্না ও দৈনন্দিন কাজে চরম ভোগান্তির মুখে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। অনেক এলাকায় গ্যাস না পেয়ে সিলিন্ডার কিনতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে ভোক্তাদের। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই জানুয়ারি মাসে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের তিনটি ইউনিটের মধ্যে একটি ২০২০ সাল থেকেই বন্ধ রয়েছে। আরেকটি ইউনিট গত বছরের নভেম্বর মাস থেকে উৎপাদনের বাইরে। সর্বশেষ সচল ইউনিটটিও রোববার সকালে বয়লারের টিউব ফেটে যাওয়ার কারণে বন্ধ হয়ে যায়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রায় এক হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার বয়লার ঠান্ডা হতে কয়েক দিন সময় লাগবে, এরপর মেরামতের কাজ শুরু করা সম্ভব হবে। তবে কবে নাগাদ উৎপাদন পুনরায় শুরু হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাতে পারেননি কর্তৃপক্ষ।
বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলীর ভাষ্য অনুযায়ী, মেরামত ও যন্ত্রাংশ সংক্রান্ত জটিলতার কারণে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে। জানা গেছে, প্রথম ইউনিটের ওভারহোলিং হওয়ার কথা থাকলেও তা যথাযথভাবে হয়েছে কি না—এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গত ৩০ ডিসেম্বর ইউনিটটি বন্ধ হওয়ার পর মেরামত শেষে ১৪ জানুয়ারি চালু করা হলেও মাত্র চার দিন পর আবার বন্ধ হয়ে যায়।
তৃতীয় ইউনিটের জন্য চীন থেকে যন্ত্রাংশ আনার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মার্চ মাসে আংশিকভাবে উৎপাদনে ফেরার সম্ভাবনা থাকলেও তা নিশ্চিত নয়। অন্যদিকে, প্রায় পাঁচ বছর ধরে বন্ধ থাকা দ্বিতীয় ইউনিটটি চালু করতে যন্ত্রাংশের মূল্য বৃদ্ধি নিয়ে ঠিকাদারদের সঙ্গে আলোচনা আটকে আছে।
এদিকে আবহাওয়াবিদরা চলতি বছরে দীর্ঘমেয়াদি ও তীব্র তাপপ্রবাহের আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত দেশের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এমন অবস্থায় বিদ্যুৎ ঘাটতি হলে জনজীবনে মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন।
ইতোমধ্যেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং শুরু হয়েছে। সরকারিভাবে বলা হচ্ছে, চাহিদা কম থাকায় কিছু বিদ্যুৎ কেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে, জ্বালানি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রীষ্মকালে বিদ্যুৎ সংকট তীব্র হলে হাসপাতাল, শিল্পকারখানা, কৃষি সেচ এবং সেবাখাতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। বয়স্ক, শিশু ও অসুস্থ মানুষের জন্য পরিস্থিতি বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলেও তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর জোর দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আসন্ন গ্রীষ্মে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট আরও গভীর আকার ধারণ করতে পারে।

