ঢাকা অফিস: ‘মোষ কাণ্ড’ কেন্দ্রিক অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাপ সামলে উঠতে না উঠতেই এবার সম্পূর্ণ নতুন এক ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছে বিএনপি সরকার। আমেরিকার সাথে সাম্প্রতিক নানা সমীকরণ মিলিয়ে যখন সরকার ভাবছিল ক্ষমতার পথ আপাতত মসৃণ, ঠিক তখনই পাসপোর্ট বিতর্ক এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য নীতি ঢাকাকে এক কঠিন কূটনৈতিক পরীক্ষায় ফেলে দিয়েছে।
সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের একটি ঘোষণা রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। তিনি জানিয়েছেন, ২০২০ সালে বাংলাদেশের পাসপোর্ট থেকে বাদ দেওয়া “except Israel” (ইসরায়েল ব্যতীত) শব্দগুচ্ছ আবার ফিরিয়ে আনা হবে। সরকারের এই সিদ্ধান্ত মূলত তাদের দীর্ঘদিনের ইসরায়েল নীতিরই অংশ, যেখানে ইসরায়েলকে একটি ‘শত্রু রাষ্ট্র’ হিসেবে গণ্য করা হয়।
তবে ঢাকার এই নীতিগত অবস্থান খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন বৈশ্বিক এজেন্ডার সাথে সরাসরি সংঘাত তৈরি করতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ট্রাম্প প্রশাসন এবার তাদের বহুল আলোচিত ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ড’ বা ইব্রাহিম চুক্তি বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করছে। ইতোমধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সৌদি আরব, কাতার, পাকিস্তান এবং তুরস্কের মতো মুসলিমপ্রধান দেশগুলোকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন—অনতিবিলম্বে ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হবে।
ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে স্পষ্ট যে, ট্রাম্পের এই আহ্বান উপেক্ষা করা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জন্য কঠিন হবে। বিশেষ করে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দেশগুলো আমেরিকার ‘শত্রু’ তালিকায় নাম লেখানোর ঝুঁকি এড়াতে ট্রাম্পের প্রস্তাবে সায় দিতে পারে।
ঠিক এই রকম একটি নাজুক সময়ে বাংলাদেশের পাসপোর্টে নতুন করে ইসরায়েল নিষেধাজ্ঞা ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের নজর কেড়েছে। আমেরিকা ও ইসরায়েলের সাথে ইরানের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে ঢাকার এই সিদ্ধান্তকে ট্রাম্প প্রশাসন কীভাবে নেবে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় প্রশ্ন।
বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটন নিশ্চিতভাবেই এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে ঢাকাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার চেষ্টা করবে। ট্রাম্প প্রশাসন যদি সরাসরি প্রশ্ন তোলে—”আমেরিকার মিত্র ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কেন এই অবস্থান?” কিংবা বাংলাদেশকে যদি আব্রাহাম অ্যাকর্ডে স্বাক্ষর করার জন্য চাপ দেওয়া হয়, তবে বিএনপি সরকার চরম সংকটে পড়বে।
আমেরিকার মতো পরাশক্তিকে সরাসরি “গেট লস্ট” বলা বা তাদের চাপ উপেক্ষা করা বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় কতটা সম্ভব, তা নিয়ে সন্দিহান খোদ কূটনৈতিক মহল।
ট্রাম্প প্রশাসন অসন্তুষ্ট হলে তৈরি পোশাক খাত বা বাণিজ্য ক্ষেত্রে নতুন শর্ত জুড়ে দিতে পারে।
পাকিস্তান বা সৌদি আরব ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়বে কিনা, তা ভাববার বিষয়।
দেশের ভেতরে ইসরায়েল-বিরোধী সেন্টিমেন্ট বজায় রাখা এবং বাইরে আমেরিকার সাথে সুসম্পর্ক টিকিয়ে রাখা—এই দুই নৌকায় একসাথে পা দিয়ে চলাটাই এখন বিএনপি সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
‘মোষ কাণ্ড’ থেকে বাঁচলেও, ওয়াশিংটনের এই নতুন ‘ইসরায়েল ফাঁদ’ থেকে বিএনপি সরকার কীভাবে নিজেদের মুক্ত করবে, নাকি নতুন কোনো বৈশ্বিক ফ্যাসাদে জড়িয়ে পড়বে—তা সময়ই বলে দেবে।
